আফরিন বেগম, বাম রাজনীতির পরিসরে এক নতুন কিন্তু দ্রুত উত্থানশীল নাম। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন। নির্বাচন কমিশনের বৈঠকে মহম্মদ সেলিম-এর পাশে বসে তাঁর আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি এবং পরবর্তীতে তাঁর ঝাঁজালো অথচ যুক্তিনিষ্ঠ বক্তব্য সমাজমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। অনেকেই তখনই এই তরুণ নেত্রীকে বাম শিবিরের ‘তরুণ তুর্কি’ বলে আখ্যা দিতে শুরু করেন। সেই আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই বামফ্রন্ট তাঁকে বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রার্থী ঘোষণা করে। যা আরও কৌতূহল বাড়িয়ে দেয় রাজনৈতিক মহলে।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এত দ্রুত কীভাবে এই উত্থান? আফরিন নিজের রাজনৈতিক পথচলার কথা বলতে গিয়ে জানান, তাঁর শুরুটা ছাত্র রাজনীতি থেকেই। ছাত্রজীবনে তিনি এসএফআই-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে দলের বিভিন্ন দায়িত্বে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। সংগঠনের কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ, মানুষের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে তোলা এবং দলীয় দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন, এই পথ ধরেই তিনি এগিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘দল আমাকে যখন যেমন কাজ দিয়েছে, আমি সেটা করার চেষ্টা করেছি। আজ দল আমাকে আরও বড় দায়িত্ব দিয়েছে। এটা শুধু প্রার্থী হওয়া নয়, মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ।’ এবারের বালিগঞ্জ কেন্দ্রের লড়াই যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তা বলাই বাহুল্য। এই কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বর্ষীয়ান নেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, যিনি প্রয়াত সুব্রত মুখার্জি-র আসনে প্রার্থী হয়েছেন। অন্যদিকে বিজেপি এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে ডা. শতরূপাকে। কংগ্রেসের হয়ে লড়ছেন রোহন মিত্র। ফলে চারদিক থেকে হেভিওয়েট প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে একেবারে নতুন মুখ হিসেবে আফরিনের প্রার্থিতা স্বাভাবিকভাবেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করছেন, সিপিআই(এম) কি তাঁকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিল? তবে আফরিন এই বিষয়টিকে অন্যভাবে দেখছেন। তাঁর মতে, দলের আস্থা থাকলেই এই দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমি বালিগঞ্জেরই মেয়ে। এখানকার সমস্যাগুলো আমার নিজের বাড়ির সমস্যার মতো। ছোট থেকে এই এলাকায় বড় হয়েছি, তাই মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, অভাব-অভিযোগ সবই খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেই কারণেই দল আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে বলে আমি মনে করি।’
প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিক থাকায় লড়াই যে সহজ হবে না, তা স্বীকার করলেও আফরিন আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষের জন্য লড়তে নেমেছি। বাংলাকে বাঁচানোর এই লড়াইয়ে মানুষ আমাদের পাশে আছেন। মানুষ সঙ্গে থাকলে কোনও ভয় নেই।’
বালিগঞ্জে পরিযায়ী শ্রমিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে। তাঁদের প্রসঙ্গে আফরিন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, তৃণমূল সরকারের আমলে শিল্পায়ন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। নতুন কারখানা গড়ে ওঠেনি, ফলে রাজ্যের যুবসমাজ কাজের খোঁজে বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি, আইনি জটিলতা এবং দীর্ঘসূত্রিতার কারণে বহু মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন। এমনকি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এর ফলে অনেক শিক্ষক তাঁদের চাকরি হারিয়েছেন।
একইসঙ্গে, বাইরে কাজ করতে যাওয়া বাঙালি শ্রমিকদের উপর অত্যাচারের প্রসঙ্গ তুলে বিজেপিকেও আক্রমণ করেন তিনি। তাঁর মতে, অন্য রাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্যও অনেক সময় হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। ফলে বহু পরিযায়ী শ্রমিক বাধ্য হয়ে ফিরে আসছেন এবং তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিকে তিনি রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
জয়ী হলে বালিগঞ্জের জন্য তাঁর পরিকল্পনা নিয়েও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন আফরিন। তাঁর মতে, এই এলাকায় মৌলিক পরিষেবার ক্ষেত্রে এখনও বহু ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল এবং নিকাশি ব্যবস্থা, এই চারটি ক্ষেত্রকে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চান। বিশেষ করে বস্তি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন তাঁর অন্যতম লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ‘সরকারি স্কুলগুলিতে শিক্ষক সংকট রয়েছে। অনেক জায়গায় একাধিক বিষয় পড়ানোই বন্ধ হয়ে গেছে। এগুলো ঠিক করা জরুরি। একইভাবে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। সেগুলিকে শক্তিশালী করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে না হয়।’
নিকাশি ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করাও তাঁর অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। পাশাপাশি তিনি বস্তি এলাকায় পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির কথা বলেন। এইভাবে একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে উঠে এসে বালিগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন তিনি। তাই আফরিন বেগমের রাজনৈতিক যাত্রা এখন অনেকের কাছেই আগ্রহের বিষয়। আগামী নির্বাচনে তাঁর এই আত্মবিশ্বাস এবং জনসংযোগ কতটা ফলপ্রসূ হয়, সেটাই এখন দেখার।