প্রায় প্রতিটি নির্বাচনী সভা থেকেই তৃণমূলের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দ্বিতীয় দফার ভোটকে সামনে রেখে শনিবারও নির্বাচনী প্রচারে শাহকে সেই সুরেই কথা বলতে শোনা গিয়েছে। পূর্ব বর্ধমান থেকে হাওড়া— একাধিক জনসভা ও রোড শো করে তৃণমূল কংগ্রেসকে তীব্র আক্রমণ শানালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরে সভা দিয়ে দিনের প্রচার শুরু করেন তিনি। সেখান থেকেই শাহ দাবি করেন, প্রথম দফায় বিজেপি বড়সড় সাফল্য পাবে এবং রাজ্যে পরিবর্তন আসবেই। তাঁর কথায়, ‘৪ মে বর্ধমানের মিহিদানা-সীতাভোগে মোদীজির মিষ্টিমুখ করাব।’ পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে তৃণমূল সরকারের আমলে সবচেয়ে বেশি অত্যাচার হয়েছে নারী ও সাধারণ মানুষের উপর।
শনিবার বিকেলের দিকে পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরে প্রথম জনসভা করেন তিনি। সেখান থেকেই আত্মবিশ্বাসী সুরে দাবি করেন, প্রথম দফায় বিজেপি বড় জয় পেতে চলেছে এবং রাজ্যে দিদির খেলা শেষ হতে চলেছে। তিনি বলেন, ‘৪ মে আমরা জিতলে বর্ধমানের সীতাভোগ খাইয়ে উদযাপন করব।’ একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ‘১৫ বছরে মমতাদিদির জমানায় সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাস হয়েছে মা-বোনেদের উপর। আরজি কর, সন্দেশখালি প্রতি জায়গায় মা-বোনেদের উপর অত্যাচার হয়েছে। কিন্তু দিদি বলেন, মা-বোনেরা সন্ধ্যা ৭টা পর বাড়ি থেকে বেরোবেন না। কিন্তু আমি বলে যাচ্ছি, বিজেপি সরকার এলে মাঝরাতেও মা-বোনেরা বেরোতে পারবেন।’
নারী নিরাপত্তা নিয়ে আক্রমণ শানিয়ে শাহ দাবি করেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে মহিলারা মাঝরাতেও নিরাপদে বাইরে বেরোতে পারবেন। তাঁর কথায়, ‘দেশের ২০ রাজ্যে বিজেপির সরকার আছে। কোনও মুখ্যমন্ত্রী এ কথা বলেননি মহিলারা ৭টার পর ঘরের বাইরে বেরোবেন না। লজ্জা করুন দিদি, মহিলাদের আপনি সুরক্ষা দিতে পারেননি।’ পাশাপাশি তিনি তৃণমূলকে কটাক্ষ করে বলেন, গুন্ডাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টে তাদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেছেন, ‘দিদি আমার উপর রেগে যাচ্ছেন। অমিত ভাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে গুন্ডাদের ধমকাচ্ছেন। আরে দিদি, গুন্ডাদের কি ভালবাসব আমি। গুন্ডাদের ধমকানো উচিত কি না আপনারা বলুন তো? এখন শুধু ধমকাচ্ছি, শুধরে যাও, না হলে তোমাদের জায়গা হবে জেলের ভিতরে।’ তিনি হুঁশিয়ারি দেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মতুয়া ও নমশূদ্র সমাজের উদ্দেশেও এদিন বিশেষ বার্তা দিয়েছেন শাহ। তিনি বলেন, এই সমাজ বিজেপির কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে কোনও ভয় পাওয়ার কারণ নেই। মতুয়াদের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মতুয়া সমাজ, নমশূদ্র সমাজের ব্যক্তিদের ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। সিএএ করতে দিচ্ছে না দিদি। আপনারা বিজেপির সরকার বানিয়ে দিন, ৫ তারিখের পর মতুয়া সমাজের সব ভাই-বোনকে নাগরিকত্ব দেবে বিজেপি।’
পাশাপাশি জামালপুরের অনুন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলে শাহ বলেন, ‘জামালপুরে কোনও কাজ হয়েছে? রেল ক্রসিংয়ে একটাও আন্ডারপাস হয়েছে? গুন্ডার টোল ট্যাক্স উসুল করছে। ইট, বালি, সিমেন্টের উপর টোল ট্যাক্স। এগুলো টোল ট্যাক্স নয়, ভাইপো-ট্যাক্স। ৫ তারিখে বিজেপির সরকার বানিয়ে দিন, ৬ তারিখে সব সিন্ডিকেটরাজ বঙ্গোপসাগরে ছুড়ে ফেলব।’ রাজ্যের উন্নয়নের টাকা দুর্নীতির জালে হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁর প্রতিশ্রুতি, বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই সমস্ত দুর্নীতি বন্ধ করা হবে।
এরপর হাওড়ার শ্যামপুরে সভা তিনি দাবি করেন, জনসমাগম দেখেই বোঝা যাচ্ছে মানুষ পরিবর্তন চাইছেন। তিনি বলেন, বিজেপি সরকার গঠিত হলে মহিলাদের আর্থিক সহায়তা হিসেবে প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা দেওয়া হবে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। গুন্ডাদের বিরুদ্ধে আবারও কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, ‘মা-বোনদের গায়ে হাত তুললে কাউকে ছাড়া হবে না।’
কৃষকদের জন্যও একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। শাহ জানান, ধান প্রতি কুইন্টাল ৩,১০০ টাকা দামে কেনা হবে এবং বছরে ৯ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। কাটমানি প্রথা বন্ধ করে সেই টাকা সরাসরি কৃষকদের অ্যাকাউন্টে দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। পাশাপাশি শিল্পোন্নয়ন নিয়ে বলেন, গত কয়েক বছরে বহু কারখানা রাজ্য ছেড়েছে, বিজেপি ক্ষমতায় এলে সেগুলি ফিরিয়ে আনা হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো হবে।
এদিন অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) চালুর কথাও ফের উল্লেখ করেন শাহ। তাঁর বক্তব্য, বিজেপি সরকার এলে একাধিক বিয়ের মতো প্রথা বন্ধ করা হবে। এছাড়া ধর্মীয় ইস্যুতেও তৃণমূলকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, বাংলার সংস্কৃতিকে রক্ষা করা হবে। শাহ বলেন, ‘মোদীজি অযোধ্যায় রামমন্দির বানিয়েছেন। আর অন্যদিকে, হুমায়ুন কবীরকে দিয়ে এখানে মমতাদিদি বাবরি মসজিদ বানাতে চাইছেন। কান খুলে শুনে রাখুন, একজনও বিজেপি কর্মী বেঁচে থাকলে পশ্চিমবঙ্গে বাবরি মসজিদ বানাতে দেবে না। এটা ভারতের ভূমি, এখানে কোনও বাবরি মসজিদের জায়গা নেই। পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে তৈরি হবে তো সেটা দুর্গামন্দির।’
দিনের শেষে হাওড়ার রামরাজাতলা ও যাদবপুরে রোড শো করেন শাহ। সব মিলিয়ে দ্বিতীয় দফার আগে তাঁর এই আগ্রাসী প্রচার রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এদিন মতুয়া ভোটব্যাঙ্ক এবং নারী নিরাপত্তার ইস্যুকে সামনে রেখে শাহ আসলে তৃণমূলের দূর্গে সরাসরি হানা দিতে চেয়েছেন। এখন নজর ভোটের ফলাফলের দিকে— এই প্রচারের প্রতিফলন ব্যালট বাক্সে কতটা পড়ে, সেটাই দেখার।