অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: ভোট মরশুমের এক দুপুরে শেওড়াফুলি স্টেশনে কথা হয়েছিল, এক ছোটো ব্যবসায়ীর সঙ্গে। বাড়ি চাঁপদানিতে। তিনি পণ্য ফেরি করেন শেওড়াফুলিতে। এলাকায় কাজ কেমন হয়েছে? মধ্যবয়সি বলেছিলেন, খারাপ না। আমাদের প্রয়োজনগুলি চাঁপদানির কাউন্সিলার অরিন্দম গুঁইন মিটিয়ে দেন। কিন্তু অরিন্দম তো বিধায়ক! মানতে নারাজ ওই মাঝবয়সি ব্যক্তি। তাঁর বক্তব্য, অরিন্দম নাকি সব কাজেই থাকেন। অতএব তিনি কাউন্সিলার। তাঁর কথার খুঁত ধরায় রাগে গজগজ করতে করতে চলে যাচ্ছিলেন। আচমকা থেমে বললেন, বিধায়ক, কাউন্সিলার এসব শুধু পদের নাম। কাজের কাজটা করে কি না, সেটাই বড়ো কথা।
ভোটপ্রচারের শেষলগ্নে গল্পটা শুনে চাঁপদানি বিধানসভার এক দাপুটে তৃণমূল নেতা হেসে গড়িয়ে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, বুবাই (অরিন্দমের ডাক নাম) ওই রকমই। ও সত্যিই এখনও কাউন্সিলারই আছে। চাঁপদানি বিধানসভার ছোটো-বড়ো সব কাজেই পাওয়া যায় ওকে। রাস্তাঘাট, আলো, অ্যাম্বুলেন্স, সাফাই-নিকাশি, সাধারণ কিন্তু প্রাত্যহিক প্রয়োজনের কাজ করেছে। তাতে ভোট মরশুমে আমাদের জন্য সুবিধা হয়েছে। নেতার নামটা লেখা গেল না। বুবাইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক একটু মিঠেকড়া। কিন্তু মূল বিষয়টি হল, চাঁপদানি বিধানসভায় চাঁপদানি ও বৈদ্যবাটি, দু’টি পুরসভা এবং শ্রীরামপুর পুরসভার একাংশ আছে। তারপরেও বিধায়ককে মানুষ কাউন্সিলার মনে করেন। এতটাই স্বাভাবিক তাঁর ভাবমূর্তি। অথচ তৃণমূলের প্রার্থী এক হিসাবে জায়েন্ট কিলার। ২০২১ সালে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা প্রবীণ বিধায়ক আব্দুল মান্নানকে হারিয়ে জিতেছিলেন। তারপর আর মাঠ ছাড়েননি তৃণমূলের তরুণ মুখ। অরিন্দম বলেন, ২০১১ সালে দলের জেতা আসন ২০১৬ সালে আমরা হারাই। বস্তুত উন্নয়ন থমকে যায়। আমি জেতার পরে তাই বুনিয়াদি, প্রাত্যহিক সমস্যাগুলি মেটানোর কাজ আগে করেছি। আমাদের বৈদ্যবাটি পুরসভা আজ সাফাইয়ে দেশের এক নম্বর। চাঁপদানির চেহারা বদলে গিয়েছে। আমি কি বা কে, সেটা জরুরি নয়, আমার কাজ কি সেটা জরুরি। চাঁপদানির মানুষ আমার পাশে আছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
এ যদি পুরুষের গল্প হয় তাহলে একটি নারীকেন্দ্রিক গল্পও চাঁপদানিতে আছে। চাঁপদানি বিধানসভার একাংশ যেমন শিল্পবলয়, তেমনই অন্য অংশ নিখাদ নাগরিক কলোনির রমরমা। একদিকে অবাঙালি মানুষের প্রাধান্য, অন্যদিকে বাংলার আদি বাসিন্দাদের বসত। কিন্তু দু’টি এলাকাকেই জুড়েছে একটি সাধারণ সূত্র, মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী। বাম আমলে শিল্পবলয়ের শ্রমিকদের বাড়িতে বাড়তি আয়ের সুযোগ ছিল না। ফলে, শ্রমিক মহল্লাগুলির হাল খারাপ হয়েছিল। বর্তমানে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সঙ্গে শ্রমিক মহল্লাকে আর্থিকভাবে শক্তি দিয়েছে স্বনির্ভর গোষ্ঠী। বিকল্প আয়ের দরজা খুলেছে। চাঁপদানি, বৈদ্যবাটিতে বাড়ির ছোটোখাটো প্রয়োজনে গোষ্ঠী থেকে ধারের সুযোগ মহাজনি ব্যবস্থার অবসান করেছে। শ্রমিক-প্রান্তিক নাগরিক এলাকার হাল ফিরেছে। এই উপলব্ধি লালপার্টির এক সাবেক শ্রমিক নেতার। বর্তমানে তিনি গেরুয়া সমর্থক। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা বলেন, মেয়েদের গোষ্ঠী একটা ম্যাজিক করেছে। যদিও মানতে নারাজ সিপিএম প্রার্থী চন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কর্মসংস্থান নেই। মানুষ এবার বদলে দেবেন। বদলের দাবি করেছেন বিজেপি প্রার্থী দিলীপ সিংও। তিনি বলেন, বাম থেকে তৃণমূল, সবাই ভোট নিয়েছে, কিন্তু কোনো উন্নয়ন করেনি। এবার বদলের ইঙ্গিত সর্বত্র ঘুরছে। যদিও জনশ্রুতি, দিলীপবাবু বারবার ভোটে লড়েন কিন্তু তারপরে আর আম জনতার সুখেদুঃখে থাকেন না। তাঁর দলের কর্মীদের একাংশের কথায়, ‘দাদার হাত লম্বা আছে। দিল্লিতে ভি কথা করতে পারেন। মহল্লার যোগাযোগটা একটু পসন্দ করলে ভালো হোতো।’ এই গল্পটা জানেন অরিন্দম। তাই ভোট যত কাছে আসছে, তাঁর হাসি তত চওড়া হচ্ছে।