সৌমেন রায়চৌধুরী
পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্র (Panihati Assembly constituency) ছাব্বিশের ভোটে অন্যতম ভরকেন্দ্র। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার এই বিধানসভা কেন্দ্র দমদম লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। এর আগে কোনও ভোটে পানিহাটি নিয়ে এত চর্চা হয়নি। এ বার ‘হেভিওয়েট’ লড়াই এই কেন্দ্রে। বিজেপি এখানে প্রার্থী করেছে আরজি করের নির্যাতিতার মাকে। অন্যদিকে সিপিএমও এখানে চমক রেখেছে। তাদের প্রার্থী কলতান দাশগুপ্ত। বাম রাজনীতির তরুণ মুখ। আরজি কর আন্দোলনের সময়ে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন তিনি। এই কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষ। বিদায়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষের ছেলে তিনি। কংগ্রেস প্রার্থী করেছে শুভাশিস ভট্টাচার্যকে। ফলে লড়াই জমে উঠেছে পানিহাটিতে। গোটা রাজ্য তাকিয়ে এই কেন্দ্রের দিকে।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ৩৩টি বিধানসভার মধ্যে পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্রে এ বার নজর সব রাজনৈতিক দলের। লড়াই হাড্ডাহাড্ডি, কেউ এক ইঞ্চিও জায়গা ছাড়তে রাজি নয়। আরজি করের নির্যাতিতার মায়ের প্রার্থী হওয়া নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া দ্বিধাভক্ত। এক পক্ষের দাবি, কেন্দ্রে সরকারে থাকা দলের হাত শক্ত করে মেয়ের বিচার ছিনিয়ে আনতে চাওয়ায় কোনও দোষ নেই? আর এক পক্ষ বলছে, ‘এই ঘটনার তদন্তভার সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বা CBI-এর হাতে রয়েছে। নিটফল কী হয়েছে? বরং এই ঘটনায় একজনকেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, যাকে গ্রেপ্তার করেছিল কলকাতা পুলিশ।’ যদিও তর্ক বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে রাজনীতির ময়দানে নামার অধিকার সকলেরই আছে। সেই অধিকারে ভোটের ময়দানে অভয়ার মা-ও।
এক সময়ে এই পানিহাটি ছিল বামেদের গড়। পুরোনো ঘাঁটি উদ্ধারে সিপিএমের ভরসা কলতান। আরজি কর আন্দোলনের প্রতিবাদী মুখ কলতানকে সেই সময়ে গ্রেপ্তার পর্যন্ত হতে হয়েছিল। অনেকে বলছেন, এ বার পানিহাটিতে আসল লড়াইটা বিজেপি বনাম সিপিএমের।
তৃণমূলের প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষ টানা তিন বারের জয়ী বিধায়ক নির্মল ঘোষের ছেলে হওয়ায় ‘ফ্যাক্টর’ হিসেবে পরিবারিক প্রভাব বড় ভূমিকা নিতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ২০২১ সালের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল এই বিধানসভায়। নির্মল ঘোষ সে বার পেয়েছিলেন ৮৬ হাজার ৪৯৫ ভোট। বিজেপির সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৬১ হাজার ৩১৮। শতাংশের বিচারে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫০, বিজেপি ৩৫। এ ছাড়া একুশে কংগ্রেস প্রার্থী তাপস মজুমদার পেয়েছিলেন ২১ হাজারের কিছু বেশি ভোট। নোটায় ভোট পড়েছিল ২ হাজার ৩৩৪টি।
পাল্টে যাওয়া রাজনৈতিক মানচিত্রে লাল পরবর্তী সময়ে সবুজ গড় হিসেবে রূপান্তরিত হয় পানিহাটি। অতীতে সিপিএম এখানে আট বার জয়লাভ করেছে। কংগ্রেসও দু’বার জিতেছে। কিন্তু ২০১১ সালের পর থেকে তৃণমূল টানা তিন বার জয়ী হয়েছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, গত এক দশকে পানিহাটির রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে এবং তৃণমূল তাদের সংগঠন মজবুত করেছে। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই একই এলাকায় চিত্র কিছুটা বদলাতে দেখা যায়। তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও বিজেপি তাদের ভোটের ব্যবধান কিছুটা কমাতে সক্ষম হয়।
এ বারের ভোটে কয়েকটি বিষয় বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এলাকায়। তৃণমূলের টার্গেট আসন সামলানো। সিপিএমের লক্ষ্য পুরনো ঘাঁটি পুনরুদ্ধার করা, বিশেষ করে বাম ভোট একত্রিত করা। কংগ্রেসের এখানে খুব বেশি প্রভাব না থাকলেও ভোট কাটার ক্ষেত্রে ভূমিকা নিতে পারে। যদিও সেই ভোট কাটায় তৃণমূল না বিজেপির উপকার হবে, তা বোঝা যাবে ৪ মে, ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরেই। আর বিজেপি এখানে এমন প্রার্থী দিয়েছে, যেখানে সহানুভূতির ভোট একটা ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে।
বিজেপি প্রার্থী প্রচারে বেরিয়ে যেমন বিরোধিতার মুখে পড়েছেন, তেমনই বহু মানুষ তাঁকে সমর্থনও জানাচ্ছেন। সিপিএমের কলতান প্রচারে কোনও খামতি রাখছেন না। দিনরাত এক করে প্রচার করছেন। মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ বাড়ানো, এলাকার সমস্যা সমাধানের আশ্বাস আর শাসকশিবিরের ভুল ধরিয়েই প্রচার চলছে কলতানের।
২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফার ভোটে পানিহাটির ভাগ্য নির্ধারণ করবেন জনতা। ৪ এপ্রিল গণনার পরেই বোঝা যাবে ভাগ্য বিধাতারা (নির্বাচনে ভোটাররাই নির্ণায়ক শক্তি ) কার ভাগ্যে কী লিখলেন।