• রেশন ‘চুরি’ বনাম SIR-এ মতুয়া নাম বাদ, হাবড়ার জটিল অঙ্ক সামলে কলঙ্ক মুছতে পারবেন বালু?
    প্রতিদিন | ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচন (West Bengal Assembly Election) পর্ব শেষের পথে। আগামী ২৯ এপ্রিল, কলকাতা ও দুই ২৪ পরগনা-সহ ১৪২ আসনে ভোট। এই দফার অন্যতম নজরকাড়া জেলা উত্তর ২৪ পরগনা। এখানকার একাধিক কেন্দ্রের ফলাফল আগামী সরকার গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। তারই মধ্যে অন্যতম হাবড়া। এবার এই কেন্দ্র রাজনৈতিক মহলে এতটা চর্চার কারণ একটিই। রাজ্যের বিদায়ী মন্ত্রীর কেন্দ্রটি ঘিরে রেশন দুর্নীতির মতো জঘন্য অপরাধের ছায়া। শুধু তাই নয়, অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে জেলে পর্যন্ত থাকতে হয়েছে রাজ্যের প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী তথা এখানকার ৩ বারের জনপ্রতিনিধি জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে। সময়ের চাকা ঘুরে জামিনে মুক্ত সেই জ্যোতিপ্রিয়ই এবারও হাবড়ার তৃণমূল প্রার্থী। লড়াইয়ে বিরোধী সিপিএমের অভিজ্ঞ মুখ ঋজিনন্দন বিশ্বাস, গেরুয়া শিবিরের বিতর্কিত নেতা দেবদাস মণ্ডল। রেশন দুর্নীতি ছাড়াও এখানে ছাব্বিশের ভোটের বড় ইস্যু এসআইআর। হাবড়ার একটা অংশ মতুয়া অধ্যুষিত। সেখানে প্রচুর মানুষের নাম বাদ পড়েছে। ফলে নির্বাচনে তার প্রভাব ভালোই পড়বে। দেখে নেওয়া যাক, কেমন হতে চলেছে এখানকার নির্বাচনী যুদ্ধ।

    হাবড়া বিধানসভা এলাকার মোট ভোটার সংখ্যা ২ লক্ষ ৩৪ হাজার ৫৮৩। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লক্ষ ২০ হাজার ৬৬৭ এবং মহিলা ১ লক্ষ ১৩ হাজার ৯১৬। এর মধ্যে তফসিলি জাতিভুক্ত ভোটারের সংখ্যা ৬৯,১৯৬। তবে এবছর এসআইআরের কারণে প্রায় ১০ হাজার ৪৮৩ নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই মতুয়া বলে জানা যাচ্ছে। হাবড়া পৌরসভা, পৃথিবা, কুমড়া, রাউতারা, মছলন্দপুর ২ গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে তৈরি হাবড়া বিধানসভা কেন্দ্রটি। আগে কংগ্রেসের দখলে থাকলেও আশির দশক একটানা হাবড়া ছিল সিপিএমের অধীনে। ২০০১ সালে একবার তৃণমূল কংগ্রেসের তপতী দত্ত জয়ী হলেও পরেরবার, ২০০৬ সালে ফের তা সিপিএমের দখলে চলে যায়। ২০১১ সালে রাজ্যজুড়ে পরিবর্তনের ঝড়ে হাবড়ায় পাকাপাকিভাবে জোড়াফুল ফোটে। বিধায়ক হন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, স্থানীয় মহলে যিনি ‘বালু’ নামে অধিক পরিচিত। ২০১৬ এবং ২০২১ সালেও তিনি গড় ধরে রেখেছিলেন। ছাব্বিশে তাঁর সামনে চতুর্থবার বিধায়ক হওয়ার সুযোগ।

    তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম পছন্দের নেতা ‘বালু’। তাঁকে খাদ্যদপ্তর, বনদপ্তরের মন্ত্রিত্ব দিয়েছেন মমতা। পাশাপাশি উত্তর ২৪ পরগনার জেলা পর্যবেক্ষকের দায়িত্বও দীর্ঘদিন জ্যোতিপ্রিয় সামলেছেন সমানভাবে। ২০২৩ সালে রেশন দুর্নীতি নিয়ে ইডির মামলায় উঠে আসে তাঁর নাম। তখন তিনি রাজ্যের বনমন্ত্রী। তার আগে জ্যোতিপ্রিয়র হাতে ছিল খাদ্যদপ্তর। অভিযোগ, সেসময় তিনি রেশন সামগ্রী নিয়ে দুর্নীতিতে মদত দিয়েছিলেন। এমনকী বাংলাদেশে রেশন পাচারের অভিযোগও ওঠে। জ্যোতিপ্রিয় ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যবসায়ী, স্থানীয় কাউন্সিলরের পর সেবছর অক্টোবর মাসে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডির হাতে গ্রেপ্তার হন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। একবছর তিনমাসের বেশি সময় ধরে তাঁকে জেলবন্দি থাকতে হয়। বারবার জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। তৃণমূল সুপ্রিমো একাধিকবার অভিযোগ তোলেন, বালুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়েছে। অবশেষে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে আদালত জ্যোতিপ্রিয়র জামিন মঞ্জুর করে। তিনি হাবড়ায় ফিরে আবারও সংগঠনের কাজে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তবে বালুর এই প্রত্যাবর্তন স্থানীয় ঘাসফুল শিবির বিশেষ স্বাগত জানায়নি। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব ফের তাঁকেই হাবড়ার প্রার্থী করায় চোরা ক্ষোভ তৈরি হয়। প্রথমে কেউ তাঁর প্রচারে বিশেষ গা ঘামাননি।

    এই ছবি বদলে যায় দিন ১৫ আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাবড়ায় জ্যোতিপ্রিয়র সমর্থনে জনসভা করার পর। সেই সভা থেকে নেত্রী বলেন, ‘‘আমার মন্ত্রিসভার সবচেয়ে ভালো পারফর্মার বালু। ওর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এতদিন জেলে রেখেছিল। এবার ওকে আপনারা ভোট দিয়ে জেতান। আবারও ও কাজের সুযোগ পাবে।” এরপর স্থানীয় নেতৃত্ব রীতিমতো কোমর বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়েন জ্যোতিপ্রিয়র প্রচারে। তিনিও হালকা মুডে প্রচার সারছেন। কখনও ক্রিকেট মাঠে, কখনও ঘরোয়া সভায়, কখনও মতুয়া পাড়াগুলিতে ঘুরেছেন। মতুয়া মহলে জ্যোতিপ্রিয় বেশ জনপ্রিয়। এসআইআরে নাম বাদ পড়া মানুষজন তাঁকে দেখে ভরসা পাচ্ছেন। কারণ, তাঁরা জানেন এই লড়াইয়ে একমাত্র তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁদের পাশে রয়েছেন। তাই ঘাসফুলের ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন ঘটবে, এমনই আশা তৃণমূল নেতৃত্ব ও প্রার্থীর। হাসিমুখে জ্যোতিপ্রিয় নিজে বলছেন, ‘‘আগের চেয়ে বেশি মার্জিনে জিতব।”

    অন্যদিকে, বিজেপি এবার হাবড়ায় বালুর বিরুদ্ধে লড়তে বনগাঁ থেকে নিয়ে এসেছেন বনগাঁ সাংগঠনিক জেলার প্রাক্তন সভাপতি ও কাউন্সিলর দেবদাস মণ্ডলকে। বনগাঁয় হিন্দুত্বের মুখ হিসেবে যিনি বেশ পরিচিত। ফলে জুটেছে ‘বহিরাগত’ তকমাও। কপালে লম্বা তিলক থেকে গেরুয়া বসন – এই রূপেই তাঁকে দেখতে অভ্যস্ত মানুষ। সেইসঙ্গে লাগামহীন মুখের ভাষা। এর জন্য বারবার দেবদাস মণ্ডলকে আইনি গেরোয় পড়তে হয়েছে। তবে তাতে কুছ পরোয়া নহি তাঁর! নির্বাচনী আবহে তৃণমূলকে আক্রমণ করতে গিয়ে শালীনতার গণ্ডি অতিক্রম করে ফেলেন। প্রচার ভাষণে তিনি তৃণমূল নেতাদের ‘আমচা-চামচা’, ‘চালচোর’ বলে অনর্গল সম্বোধন করছেন। আর জনতার কাছে আবেদন জানাচ্ছেন, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ তৃণমূলের হাত থেকে বাঁচতে ভারতীয় জনতা পার্টিকে জয়যুক্ত করতে।

    হাবড়ার মাটিতে এবছর নির্বাচনী যুদ্ধের আরেক সৈনিক লালপার্টির ঋজিনন্দন বিশ্বাস। তিনি এলাকায় দীর্ঘদিনের বামপন্থী নেতা, পরিচিত মুখ। স্থানীয় এবং রাজ্যনেতাদের নিয়ে জমিয়ে প্রচার করছেন। এলাকায় ঘুরে ঘুরে বলছেন বিকল্প বামপন্থার কথা। বলছেন শিক্ষা, স্বাস্থ্যক্ষেত্রকে ‘দুর্নীতিমুক্ত’ করার কথা। মানুষের বেশ সাড়াও পড়েছে বলে দাবি তাঁর। ঋজিনন্দনবাবুর বক্তব্য, ‘‘একটা দুর্নীতিগ্রস্ত দল, আরেকটা ধর্মের রাজনীতি করা। দুয়ের কাউকেই মানুষ চায় না। এবার তাঁরা বুঝতে পেরেছেন, বামপন্থীরাই বিকল্প রাস্তার সন্ধান দিতে পারে। হাবড়ার বাসিন্দারা যথেষ্ট সচেতন, তাঁরা সঠিক মানুষকেই জনপ্রতিনিধি হিসেবে বেছে নেবেন।” এই বিশ্বাসে কি ইভিএমের বোতাম লাল হয়ে উঠবে কাস্তে-হাতুড়ি-তারা চিহ্নে? তার জবাব মিলবে ৪ মে।
  • Link to this news (প্রতিদিন)