• আমার কাঁধে পা রেখে যেন উড়ে গেলেন সিস্টার নির্মলার কাছে
    এই সময় | ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়

    ১৯৯৭-এর ৫ সেপ্টেম্বর। কলকাতার মিশনারিজ় অফ চ্যারিটি থেকে আসা একটি বার্তায় মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল দুনিয়া। মাদার টেরেসা আর নেই! আজ থেকে প্রায় তিন দশক আগের সে সময়টায় আমি তিরিশের কোঠায় পা ফেলেছি সদ্য। তত দিনে প্রথম সারির বাংলা দৈনিকের জেলা ব্যুরোর ভার এসে গিয়েছে কাঁধে।

    মাদারের প্রয়াণের পরে সেই ব্যস্ততার মধ্যেই এলো বিশেষ অ্যাসাইনমেন্ট। আমার এবং সহকর্মী নির্মাল্য মুখোপাধ্যায়ের উপরে ভার পড়ল কলকাতায় মাদারের কর্মকাণ্ড লিপিবদ্ধ করার। আয়ারল্যান্ড থেকে ১৯২৯-এ খিদিরপুর ডকে পা রেখে সেখান থেকে বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে কী ভাবে মধ্য কলকাতার ক্রিক রো-এর এক চিলতে ঘরে এসে উঠলেন, সেখান থেকে কী ভাবেই বা তাঁর সেবার যাত্রা শুরু হলো এবং মিশনারিজ় অফ চ্যারিটিতে তা পূর্ণতা পেল — লিপিবদ্ধ করতে হবে সবই। সেই সব ধারাবাহিক প্রতিবেদনে মাদারের সেবামূলক কাজের একটি বিশ্বাসযোগ্য দলিল তৈরির চেষ্টা করেছিলাম আমরা।

    এর মধ্যেই খবর এলো, সিস্টার নির্মলা (মাদারের প্রয়াণের পরে ‘মিশনারিজ় অফ চ্যারিটি’র দায়িত্ব পেয়েছিলেন) সাংবাদিক বৈঠক ডেকেছেন। সেটা ৬ সেপ্টেম্বর, মাদারের মৃত্যুর পর দিন। মাদার টেরেসা ঘোরতর অসুস্থ হয়ে পড়ার সময় থেকেই দুনিয়ার তামাম সংবাদমাধ্যমের তাবড় সাংবাদিক এবং চিত্রসাংবাদিকরা চলে এসেছিলেন কলকাতায়। ফলে, সাংবাদিক বৈঠকে ভিড় কেমন হতে পারে, তা আঁচ করে একটু তাড়াতাড়িই চলে গিয়েছিলাম রিপন স্ট্রিটের কাছে এজেসি বোস রোডের ধারে মিশনারিজ় অফ চ্যারিটির নির্দিষ্ট ঘরটিতে। তাতেও কোনওক্রমে ঠেলেঠুলে সামনের দিকে দাঁড়ানোর মতো এক ফালি জায়গা পেয়েছিলাম।

    ভিড়ের চাপ বাড়তে শুরু করল ক্রমশ। পশ্চিমী দুনিয়ার সব বড় বড় কাগজের প্রতিনিধিরা চলে এসেছিলেন! বেশ মনে পড়ে ব্রায়ান ওয়ালস্কি নামে ‘বস্টন হেরাল্ড’-এর ফোটোগ্রাফারের সঙ্গে ‘ফ্লুরিজ়’-এর সামনে আলাপ রীতিমতো ঘনিষ্ঠতায় গড়িয়েছিল। শেষকৃত্যের আগে সেই সময়ে পার্ক স্ট্রিটের কাছেই সেন্ট থমাস চার্চে মাদারের দেহ শায়িত ছিল।

    ফেরা যাক মিশনারিজ় অফ চ্যারিটিতে সিস্টার নির্মলার সেই সাংবাদিক বৈঠকে। ঠাসা ভিড়ে আচমকা বাঁ-কাঁধে একটা চাপ অনুভব করলাম। এবং চোখের পলক ফেলার আগেই দেখলাম সিস্টার নির্মলার দু’হাত দূরত্বের মধ্যে চলে গিয়ে ক্যামেরা বাগিয়ে বসলেন এক ব্যক্তি। চিনতে ভুল হওয়ার কোনও অবকাশই নেই! ইনিই রঘু রাই!

    আমার হতচকিত ব্যাপারটা তখনও কাটেনি। কারণ বয়সের হিসেব করলে তত দিনে রঘু রাই মধ্য ৫০-এ। আজও বুঝে উঠতে পারি না, কোন অ্যাক্রোব্যাটিক স্কিলে মধ্য ৫০-এর এক প্রৌঢ় ওই ভাবে আমার কাঁধে পা রেখে প্রায় উড়ে চলে যেতে পারেন তাঁর সাবজেক্টের কাছাকাছি। মনে রাখতে হবে, উচ্চতায় আমি খাটো, সে কথা কিন্তু মোটেই বলা যাবে না। তবে ওই একটি মুহূর্ত এটাও বুঝিয়ে দিয়েছিল, একজন ফোটোগ্রাফার সেরা মোমেন্ট লেন্সবন্দি করতে কতটা অ্যাগ্রেসিভ হতে পারেন। কতটা ডেডিকেটেড হলে রঘু রাই হয়ে ওঠা যায়, বুঝে গিয়েছিলাম তা-ও।

  • Link to this news (এই সময়)