আশিস নন্দী, ঠাকুরনগর
ঘড়ির কাঁটায় ঠিক দুপুর দুটো। ধুলোর ঝড় উড়িয়ে ঠাকুরবাড়ি লাগোয়া বারুনির মাঠে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে নামল বায়ু সেনার তিন তিনটি কপ্টার। তাঁর আসার অনেক আগে থেকেই বারুনির মাঠ দখলে নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপের কমান্ডো বাহিনী। হেলিকপ্টার থেকে নামতেই প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান বিজেপি নেতারা। কালো রংয়ের গাড়িতে উঠে একশো মিটার দূরে হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে সামনে নামলেন প্রধানমন্ত্রী। সাদা চুড়িদারের সঙ্গে নীল জ্যাকেট আর সাদা মোজা পায়ে গাড়ি থেকে নেমে হাতজোড় করে উঠে গেলেন হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে। হাত ধুয়ে পুজো দিলেন মোদী। মিনিট দুয়েকের মধ্যে পুজো শেষ করে মন্দিরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়েন প্রধানমন্ত্রী।
মন্দিরের নীচে অপেক্ষায় ছিলেন সস্ত্রীক কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর। ছিলেন শান্তনুর দাদা তথা গাইঘাটার বিজেপির প্রার্থী সুব্রত ঠাকুর, তাঁর বাবা মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুর, মা ছবিরানি এবং শান্তনুর দুই ছেলে। মন্দির থেকে নেমে ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। শান্তনু একে একে তাঁর বাবা–মা, স্ত্রী এবং দুই ছেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রীকে। সবুজ আর লাল রং মেশানো শাড়ি পরে স্বামী মঞ্জুলের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ছবিরানি। মোদী তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ভালো আছেন?’ উত্তরে ছবিরানি বলেন, ‘হ্যাঁ স্যর, ভালো আছি।’ এর পরেই প্রধানমন্ত্রী এগিয়ে যান শান্তনুর দুই ছেলের দিকে। দুই ভাইয়ের সঙ্গে খুনসুটি করতেও দেখা যায় তাঁকে। তাঁদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমাদের মধ্যে ঝগড়া হয় নাকি?’ উত্তরে তারা বলে, ‘মাঝেমধ্যে হয়। আবার মিটেও যায়।’ এর পরেই ফের গাড়িতে উঠে সেখান থেকে মোদী চলে আসেন ঠাকুরবাড়ির লাগোয়া পিছনের মাঠের সভাস্থলে।
২০১৯–এর ২৮ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী ঠাকুরবাড়িতে এসেছিলেন। তখন বেঁচে ছিলেন বড়মা বীণাপাণি ঠাকুর। হরিচাঁদ মন্দিরে পুজো দিয়ে বড়মাকে প্রণাম করে কিছুক্ষণ কথাও বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সাত বছর পর এ বারের নির্বাচনের আগে ফের ঠাকুরবাড়িতে মোদী এলেন মতুয়াদের মন জয় করতে। বড়মারা ঘরেই তাঁর মূর্তি বসিয়ে মন্দির করা হয়েছে। তার পাশের ঘরেই থাকেন বড়মার পুত্রবধূ তথা তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর।
এ দিন প্রধানমন্ত্রীর জন্য হরিচাঁদ–গুরুচাঁদ মন্দির, নাটমন্দির থেকে গোটা চত্বর জুড়ে মোতায়েন ছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশ।বাঁশের ব্যারিকেড করে গোটা এলাকাকে কার্যত দুর্গ বানিয়ে ফেলেছিলেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আধিকারিকরা। ঠাকুরবাড়ির সামনের রাস্তা থেকে মন্দির চত্বরে ছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। সেখানে বড়মার মন্দির এবং মমতাবালা ঠাকুরের বাসভবন ছিল বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। প্রতিদিন বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মতুয়া ভক্তরা হরিচাঁদ, গুরুচাঁদ এবং বড়মার মন্দির দর্শন করেন। কিন্তু এ দিন হরিচাঁদ মন্দিরে পুজো দিলেও বড়মার মন্দিরে যাননি প্রধানমন্ত্রী।
এই প্রসঙ্গে ছবিরানি বলেন, ‘পুজো শেষ করে প্রধানমন্ত্রী আমাদের সকলের সঙ্গে কথা বলেছেন। আমার দুই নাতির সঙ্গেও খুনসুটি করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ঠাকুরবাড়িতে আসায় খুব আনন্দ পেয়েছি।’ বড়মার মন্দিরে মোদীর না যাওয়া প্রসঙ্গে শান্তনুর স্ত্রী তথা বাগদার বিজেপি প্রার্থী সোমা ঠাকুর বলেন, ‘বড়মার মন্দির তো ঠাকুরবাড়িতে করা হয়নি। বড়মার বাড়ি তো নেই। ওটা এখন মমতাবালা ঠাকুরের বাড়ি।’ এ প্রসঙ্গে তৃণমূল প্রভাবিত মতুয়া মিঠুন রায় বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ঠাকুরবাড়িতে এসেছেন ভালো কথা। হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে পুজো বড়মার মন্দিরে আসেননি। এর থেকেই প্রমাণ হয়েছে, উনি রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি।’