আজকাল ওয়েবডেস্ক: বুধবারক রাজ্যে দ্বিতীয় দফার ভোট। তার আগেই উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দল কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হল। তৃণমূল ও বিজেপির সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। ইট-পাথর ছোড়াছুড়ি থেকে শুরু করে গুলিচালনা, সব মিলিয়ে চরম আতঙ্ক ছড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন বিজেপি নেতা অর্জুন সিং ও প্রার্থী পবন সিং। অভিযোগ, রবিবার সন্ধ্যায় জগদ্দলের আটচালা বাগান এলাকায় তৃণমূল কর্মী বিট্টু মাহাতো দলীয় পতাকা ও ব্যানার লাগাচ্ছিলেন। সেই সময় বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা তাঁকে মারধর করেন বলে তৃণমূলের অভিযোগ। আহত অবস্থায় রাতে জগদ্দল থানায় অভিযোগ জানাতে যান ওই কর্মী। সঙ্গে ছিলেন তৃণমূল নেতা সৌরভ সিং, গোপাল রাউত, দেবজ্যোতি ঘোষ-সহ আরও অনেকে।
এই খবর পেয়ে অনুগামীদের নিয়ে থানায় পৌঁছন অর্জুন সিং। প্রথমে দু’পক্ষের মধ্যে বচসা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই তা ধাক্কাধাক্কি এবং পরে মারামারির আকার নেয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। থানার সামনেই শুরু হয় ইটবৃষ্টি। একে অপরকে লক্ষ্য করে চলে লাগাতার পাথর ছোড়া। আতঙ্কে ছুটোছুটি শুরু করে সাধারণ মানুষ।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। থানার বাইরে দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলতে থাকে। অভিযোগ উঠেছে, এই সময়ই গুলিও চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনী।
এরই মধ্যে আরও বড় অভিযোগ সামনে আসে বিজেপির পক্ষ থেকে। তাঁদের দাবি, পরিকল্পিতভাবে বিজেপি প্রার্থী পবন সিংয়ের বাড়িতে হামলা চালায় তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। আচমকাই তাঁর বাড়ি লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি ইট ছোড়া শুরু হয়। সেই সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে বেরিয়ে আসেন তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সিআইএসএফ জওয়ান যোগেশ শর্মা।
অভিযোগ, ঠিক সেই সময়ই তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। গুলি গিয়ে লাগে তাঁর পায়ে। সঙ্গে সঙ্গে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। তড়িঘড়ি তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে আরও ভাল চিকিৎসার জন্য কলকাতার বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়। বর্তমানে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
এই ঘটনায় এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তৎপর হয়। ঘটনার পরই ধরপাকড় শুরু করে পুলিশ। ভাটপাড়া পৌরসভার দুই নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর-সহ, চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। আরও এক কাউন্সিলর ও ভাটপাড়ার ভাইস চেয়ারম্যানের খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
যদিও সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের দাবি, উল্টে বিজেপিই হামলা চালিয়েছে। ভাটপাড়ার তৃণমূল প্রার্থীর বক্তব্য, “আমাদের এক কর্মীকে মারধর করা হয়। অভিযোগ জানাতে থানায় গেলে অর্জুন সিং দাদাগিরি করেন। থানার মতো জায়গাতেও নিরাপত্তা নেই, এটা দুর্ভাগ্যজনক।” পাল্টা বিজেপির দাবি, তারা থানায় অভিযোগ জানাতে গিয়েছিল, সেই সময় তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা তাদের উপর হামলা চালায়। বিজেপির অভিযোগ, গোটা ঘটনাই পূর্বপরিকল্পিত এবং ভোটের আগে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে ইতিমধ্যেই রিপোর্ট তলব করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন এই ধরনের অশান্তির ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপ করতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, ভোটের মুখে এই ধরনের সংঘর্ষ নতুন কিছু নয়, তবে এবার তার মাত্রা অনেকটাই বেশি। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে থানার সামনে এই ধরনের সংঘর্ষ এবং গুলিচালনার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে প্রশাসনিক মহলেও।সব মিলিয়ে, ভোটের আগে জগদ্দলের এই অশান্তি রাজ্যের রাজনৈতিক আবহকে আরও উতপ্ত করে তুলল। এখন দেখার, প্রশাসন কত দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ ভোট পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।