পশ্চিমবঙ্গে আলু চাষিদের দুর্দশা ঘিরে রাজনৈতিক তর্জা তুঙ্গে। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে অন্যতম ইস্যু হয়ে উঠেছে আলু। দ্বিতীয় দফায় হুগলিতেও ভোট। আর তার আগে আলুর দাম নিয়ে নির্বাচনী উত্তাপ। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করলেন, বাংলার কৃষকরা তাঁদের উৎপাদনের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। তাঁর অভিযোগ, রাজ্য সরকারের নীতির কারণে বাংলার আলু ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডে পাঠানো যায় না, ফলে বাজারে দাম ধসে পড়েছে। কেজি প্রতি ২০ টাকার বদলে অনেক ক্ষেত্রেই ২ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যের আলু সারা দেশে বিক্রির পথ খুলে দেওয়া হবে এবং উন্নত মানের বীজ উৎপাদনের জন্য প্রকল্প নেওয়া হবে।
এই দাবির সত্যতা খতিয়ে দেখতে আমরা পৌঁছই হুগলির সিঙ্গুরে, যেখানে আলু চাষের ব্যাপকতা সবচেয়ে বেশি। কলকাতা থেকে মাত্র এক ঘণ্টার পথ। ভোরবেলা পৌঁছেই চোখে পড়ে, প্রায় সব গুদাম উপচে পড়ছে আলুতে। কোথাও বস্তায় ভরা, কোথাও মাটিতে স্তূপ করে রাখা। এক গুদামের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক কৃষকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাঁর চোখে স্পষ্ট হতাশা। তিনি বলেন, 'বাজারে দাম একেবারে পড়ে গেছে, কোনও রোজগার নেই। এভাবে বাঁচব কী করে?'ক্লান্তি আর হতাশা তাঁকে গ্রাস করেছে।
আরও একটি গুদামে ঢুকতেই নাকে আসে পচা আলুর তীব্র গন্ধ। সেখানে বসে থাকা এক কৃষক জানান, 'এই আলু বিক্রি হলে এখন বাড়িতে বাচ্চাদের সঙ্গে থাকতাম। কিন্তু হাতে টাকা নেই, তাই বাড়ি ফিরতেও ইচ্ছে করে না।' এই কথাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগের।
ফলন রেকর্ড হলেও সেটাই এখন বড় সমস্যার কারণ
প্রদীপ দাস, যিনি ছেলেবেলা থেকে আলু চাষের সঙ্গে যুক্ত, জানান এ বছর ফলন রেকর্ড হলেও সেটাই এখন বড় সমস্যার কারণ। তাঁর হিসেব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে চাষ করতে প্রায় ৩২ হাজার টাকা খরচ হলেও হাতে আসছে মাত্র ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ, প্রায় অর্ধেক ক্ষতি। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের বাইরে আলু পাঠাতে নানা বাধা থাকায় বাজারে জোগান বেড়ে গিয়ে দাম পড়ে গেছে। বলছেন, 'এত বেশি আলু হয়েছে যে কোল্ড স্টোরেজের আলু শেষ হতে দেড় বছর লেগে যাবে।'
এলাকার আরও কয়েকজন কৃষক একই অভিযোগ তুলেছেন, সীমান্তে গাড়ি আটকে দেওয়া হচ্ছে, ফলে আলু বাইরে যেতে পারছে না। এর ফলে গুদামে গুদামে আলু জমে পচে যাচ্ছে। এক কৃষক ক্যামেরার সামনে কথা বলতে চাননি। পরে একান্তে তিনি বলেন, 'কিছু বললে বিপদ হতে পারে। আমরা তো বাঁচতে চাই, সংসার চালাতে চাই।'
কোল্ড স্টোরেজ ভরে গেছে, নতুন আলু রাখার জায়গা নেই
জহর দত্ত নামে আরেক কৃষক জানান, 'এ বছর শুধু বাংলায় নয়, অন্য রাজ্যেও আলুর চাষ বেড়েছে। ফলে চাহিদার তুলনায় জোগান অনেক বেশি। কোল্ড স্টোরেজ ভরে গেছে, নতুন আলু রাখার জায়গা নেই। ফলে আমরা বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করছি বা অনেক ক্ষেত্রে ফেলে দিচ্ছি।' এই অবস্থার মধ্যেই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য সামনে আসে, এক কৃষক মাথায় করে পচা আলুর বোঝা নিয়ে গিয়ে ফেলছেন আবর্জনার স্তূপে। কয়েক মাসের কঠোর পরিশ্রমের ফল এভাবে নষ্ট করতে বাধ্য হওয়ার কষ্ট তাঁর মুখেই স্পষ্ট।
আরও এক কৃষক বিশ্বজিৎ জানান, টানা ক্ষতির চাপে অনেকেই ভেঙে পড়েছেন। তাঁর কথায়, 'উৎপাদন খরচ কেজি প্রতি প্রায় ৮ টাকা, কিন্তু বাজারে ৩ থেকে ৫ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। কোল্ড স্টোরেজে জায়গা নেই, ঋণের বোঝা বাড়ছে। অনেকেই সব হারিয়ে ফেলেছেন।'