নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বস্তির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃদ্ধা। মমতার হাত ছুঁয়ে তারপর শান্তি পেলেন যেন। অভিজাত আবাসনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দিদির ছবি তুলছিলেন এক মহিলা। সঙ্গে তাঁর মেয়ে। মাথা উঁচু করে হাত তুলে তাঁদের উদ্দেশে নমস্কার জানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রেলিং টপকে এসে কেউ মমতার হাতে দিয়ে গেলেন গোলাপ। মা-বাবার হাত ধরে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চার হাতে সেই গোলাপ গুঁজে দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। নির্বাচনের শেষ রবিবারোয়ারি প্রচারে ভবানীপুরে এভাবেই টুকরো টুকরো ছবিজুড়ে তৈরি হল মমতার জনসংযোগের গল্প-গাথা। শনিবার যে রাস্তায় তৃণমূল নেত্রীর সভা কার্যত বানচাল করে দিয়েছিল বিজেপি সেই পথেই জননেত্রীকে দেখতে পথে নেমে এসেছিল ভবানীপুর। মমতার সঙ্গে ছিলেন মেয়র ফিরহাদ হাকিম, স্থানীয় কাউন্সিলার অসীম বসু, কাজরি বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপরঞ্জন বক্সি সহ অন্যান্যরা। ছিলেন গায়িকা ইমনও।
এদিন ল্যান্সডাউন রোড-চক্রবেড়িয়া সংযোগস্থল থেকে পদযাত্রা শুরু করেন মমতা। এই অঞ্চল ভবানীপুরের অন্যতম সম্ভ্রান্ত এলাকা বলে পরিচিত। মমতা আসার আগে থেকেই বিভিন্ন বাড়ি-আবাসনের জানলা, বারান্দা, ছাদে অপেক্ষায় করছিলেন বাসিন্দারা। ভিড় জমিয়েছিলেন প্রচুর তৃণমূল কর্মী-সমর্থক। নেত্রী আসতেই ওঠে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। উত্তেজনায় ফেটে পড়ে জনতা। ৪টে ১২ মিনিটে হাঁটা শুরু করেন মমতা। ল্যান্সডাউন রোড-চক্রবেড়িয়া সংযোগস্থল থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাস্তা ধরে এগয় মমতার মিছিল। ইন্দ্র রায় রোডে দিদির সঙ্গে দেখা করতে দাঁড়িয়েছিলেন জনৈক মহিলা। কথা বলে জানা গেল, তাঁর পরিবারের দু’জনের নাম এসআইআরে কাটা গিয়েছে। সেই প্রতিবাদ তাঁরা জানিয়েছেন। এদিন দিদিকে সমর্থন করতে বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়িয়েছেন। বেলতলা রোডে বস্তির বাইরে রাস্তার ধারে মমতাকে দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন সব বয়সের মানুষ। এক বৃদ্ধার হাত ছুঁয়ে নিজের মাথায় পরশ নেন মমতা। রমেশ মিত্র রোডে পাঁচতলা আবাসনের জানলা খুলে মমতার মিছিল মোবাইলে ক্যামেরাবন্দি করেনন দুই জেন-জি। তাঁদের দিকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান তৃণমূল নেত্রী। একইভাবে শ্যামানন্দ রোডে বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। মোবাইলের ক্যামেরা চালিয়ে ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে ‘যে লড়ছে সবার ডাকে, সে বাঁচাবে বাংলা মাকে’ সুরে হাত দোলাচ্ছিলেন বৃদ্ধ। মাথা তুলে তাঁদের দিকে তাকিয়ে নমস্কার জানান ভবানীপুরের ঘরের মেয়ে। উল্টোদিক থেকে এসেছে প্রতি-নমস্কার। এমন একটা-দুটো ছবি নয়। রমেশ মিত্র রোড, শ্যামানন্দ রোড, বেলতলা রোড, এম এন সরণি, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি রোড, আশুতোষ মুখার্জি রোড হয়ে এগিয়েছে মমতার মিছিল। সর্বত্র স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কখনও হাত নেড়ে, কখনও নমস্কার জানিয়ে জনসংযোগ সেরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সবমিলিয়ে চষে বেড়ান ভবানীপুরের তিনটি ওয়ার্ড (৭০,৭২,৭৩)। এই ওয়ার্ডগুলি মূলত মিশ্র ভাষাভাষির মানুষদের। বিশেষ করে গুজরাতি, মাড়োয়ারি, শিখ, জৈন, বিহারী মানুষের বসবাস এখানে বেশি। এই অঞ্চলে হাঁটতে হাঁটতে একদম নিজস্ব ঢঙে ওয়ান টু ওয়ান জনসংযোগ করেন মমতা। সর্বক্ষণ বাড়ি, ছাদ, বারান্দা, জানলায় দাঁড়িয়ে তাঁর অপেক্ষায় ছিল মানুষ।
চক্রবেড়িয়া রোডে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ মমতাকে দেখতে দাঁড়িয়েছিলেন, কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে তাঁদের সঙ্গেও কথা বলেন ভবানীপুরের তৃণমূল প্রার্থী। তারপর মাইক হাতে নিয়ে বলেন, আমি আপনাদের ঘরের লোক। আপনারাই আমার শক্তি। আমি আপনাদের সঙ্গে সবসময় থাকি। জিতে আবার ধন্যবাদ জানাতে আপনাদের পাড়ায় আসব। কালীঘাট ফায়ার স্টেশনের সামনে প্রায় চার কিমি পথ হেঁটে এসে প্রায় পৌনে ছ’টায় পদযাত্রা শেষ করেন তৃণমূল নেত্রী।