• শুঁড়ে তুলে বৃদ্ধাকে আছাড় হাতির, বন দপ্তরের ভূমিকায় প্রশ্ন
    এই সময় | ২৭ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়, ঝাড়গ্রাম: হরিকীর্তন শুনে রাতে বাড়ি ফিরছিলেন এক বৃদ্ধা। কে জানত পথেই দেখা মিলবে তার। সেই সময়ে জঙ্গল থেকে একটি হাতি বেরিয়ে আসে। বৃদ্ধার সঙ্গে যাঁরা ছিলেন তাঁরা পালাতে সক্ষম হলেও বৃদ্ধা পালাতে পারেননি। হাতিটি তাঁকে শুঁড়ে তুলে আছাড় মারে। তারপর জঙ্গলের দিকে রওনা দেয়। স্থানীয় যাঁরা ছিলেন তাঁরা বৃদ্ধাকে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেন। এখন তিনি চিকিৎসাধীন। ঝাড়গ্রামের ঘটনা।

    ভোটের আগে থেকেই হাতি রুখতে নানা ব্যবস্থা নিয়েছে বন দপ্তর। কিন্তু কোনও ভাবেই তাদের আটকানো সম্ভব হয়নি। ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ঝাড়গ্রামের জনপ্রিয় হাতি রামলাল জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেছিল। বুধবার সে ভোটকর্মীদের গাড়ি রুখে দাঁড়িোয়ে পড়ে। বন দপ্তরের কর্মীরা এসে তাকে সরান। ভোটের দিনও বস্তা বস্তা আলু, চাল নিয়ে রামলালকে আটকে রাখা হয়। হাতি রুখতে তৈরি ১৫টি গাড়ি–সহ তৈরি ছিল এলিফ্যান্স ট্রেকার্স টিম। ছিল ক্যুইক রেসপন্স টিমও। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভোটের দিন রামলালকে জঙ্গলে আটকানো যায়নি। যদিও কারও কোনও ক্ষতি হয়নি সে দিন। কিংবা অন্য হাতির দলও বেরিয়ে আসেনি।

    শনিবার রাত ১০টা নাগাদ ঝাড়গ্রাম রেঞ্জের পুকুরিয়া বিটের মাসাংডিহি গ্রাম থেকে হরিনাম সংকীর্তন শুনে পাশের গ্রামে ফিরছিলেন জনা কয়েক মহিলা। আঁধারিশোল গ্রামে হঠাৎ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসা একটি হাতির সামনে পড়ে যান তাঁরা। অনেকেই ছুটে পালান। বছর ৬২–এর সাইবাণী নায়েককে সামনে পেয়ে হাতিটি আছাড় মেরে জঙ্গলে ফিরে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা ছুটে পালালেও দূর থেকে বিষয়টি দেখেন। হাতি জঙ্গলে ফেরত যেতেই তাঁরা এসে সাইবাণীকে উদ্ধার করেন। পুকুরিয়া বিটে ই বাড়ি ওই মহিলার। তাঁর পাড়ার লোকজন জানান, সাইবাণী ঠিক মতো কানে শুনতে পান না। তাঁর স্বামী ও ছেলে আছেন। কিন্তু ছেলে মানসিক ভারসাম্যহীন বলে দাবি গ্রামের লোকজ‍নের।

    পুকুরিয়া বিটের আঁধারিশোল, সরো, মাসাংডিহি, গামারিয়া, গুড়িপুকুর, পাথরচাকড়ি, গুড়িপুকুর, শিমুলডাঙা, ঢেঁকিপুরা, দুধকুণ্ডি, পাঁচামী–সহ বিভিন্ন এলাকায় আট থেকে দশ দিন ধরে সাতটি হাতি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আঁধারিশোল গ্রামের বাসিন্দা জয়ন্ত মাহাতো বলেন, ‘আমরা আতঙ্কের সঙ্গেই দিন কাটাচ্ছি। জমির পাকা ধান তছনছ করে দিচ্ছে হাতির দল। দিনের আলোতেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে লোকালয়ে চলে আসছে হাতি। সন্ধ্যার পরে বাড়ির বাইরে কেউ বেরোতে পারছি না। বন দপ্তরকে হাতি ড্রাইভ করে অন্যত্র পাঠানোর জন্য জানানো হলেও তাঁরা কোনও কর্ণপাত করছে না।’ বন দপ্তর জানিয়েছে, হাতি রুখতে সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

    ঝাড়গ্রাম রেঞ্জের পুকুরিয়া বিট এবং লোধাশুলি রেঞ্জের বিরিহাঁড়ি বিট এলাকায় সারা বছরই হাতি যাতায়াত রয়েছে। ফলে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণহানির মতন ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি গ্রামবাসীদের। এক বছর আগে আঁধারিশোল গ্রামে খগেন পাতর নামের এক গ্রামবাসীর সকালে চাষের জমি দেখতে গিয়ে হাতির হানায় মৃত্যু হয়। এক মাসের মধ্যেই গুড়িপুকুর গ্রামে কাঠের কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার সময় গ্রামে ঢোকার মুখেই হাতি হানায় মৃত্যু হয় গণেশ খিলাড়ি নামের এক গ্রামবাসীর। হাতির হানায় আহত মহিলার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে রবিবার দুপুরে হাসপাতালে যান জঙ্গলমহল স্বরাজ মোর্চার কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি তথা ঝাড়গ্রাম বিধানসভার নির্দল প্রার্থী অশোক মাহাতো। অশোক বলেন,'হাতি ও মানুষের সংঘাত রুখতে স্থায়ী সমাধানের একাধিকবার কেন্দ্র এবং রাজ্য কে ডেপুটেশন দিয়েছি । কিন্তু এখনো পর্যন্ত হাতির সমস্যার সমাধানে কেউ উদ্যোগী হলো না। জঙ্গল লাগোয়া গ্রামীণ এলাকার সাধারণ মানুষজন প্রতিদিন মৃত্যুর সঙ্গে সংঘাত করে বেঁচে রয়েছে। হাতির হানায় আহত মহিলার চিকিৎসার সম্পূর্ণ দায়িত্ব এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণ বনদপ্তরকে দিতে হবে এই দাবিও জানায়'। ঝাড়গ্রাম বন বিভাগের এক আধিকারিক বলেন,'হাতির হানায় আহত মহিলার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে । তাঁর দেখভালের জন্য একজন বনকর্মী রয়েছেন। এলাকায় হাতি থাকলে মাইকিং করে গ্রামবাসীদের সতর্ক করা হয়। হহাতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে'। রবিবার ভোররাতে পুকুরিয়া বিট এলাকায় জামবনি রেঞ্জ থেকে ২৫ থেকে ৩০ টি হাতির একটি দল ঢুকে পড়েছে। ফলে হাতির আতঙ্কে প্রহর গুনছেন আঁধারিশোল, সরো, মাসাংডিহি সহ একাধিক গ্রামের গ্রামবাসীরা।

  • Link to this news (এই সময়)