রুদ্ধশ্বাস ম্যাচের ক্লাইম্যাক্সে বলে বলে খেলার ভবিতব্য পাল্টে যাওয়ার মতোই প্রতি নির্বাচনেই রং বদলায় এই বিধানসভা। বর্ধমান পূর্ব বিধানসভায় এ বারও লড়াই ত্রিমুখী। সংগঠন নাকি আবেগ। অথবা উন্নয়ন বনাম ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। ঠিক কোন ইস্যুতে বাজিমাত করবে জামালপুর বিধানসভার প্রার্থীরা— এখন এটাই দেখার।
একদিকে, শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের শক্তিশালী সংগঠন আর তাঁর সঙ্গে রাজ্য সরকারের উন্নয়নের খতিয়ান। অন্যদিকে, মাথা তুলতে চলেছে এ বার বামেরা বলে আগাম আভাস বিশেষজ্ঞদের। বিগত নির্বাচনে বামের ভোট রামের খাতায় যাওয়ার পরিবর্তে এ বার হাল ধরতে লালে ফিরছেন মোহভঙ্গকারীরা— ফলে সিপিএমের মিছিল মিটিংয়ে মাথা বাড়ছে বলে বিশ্লেষণে দাবি ভোট বিশেষজ্ঞদের।
২০১১ থেকে ২০২৪-এর মাঝে যে ক’টা নির্বাচন গেছে, লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে বিজেপির ভোট। এ বার ২০২৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের ভূতনাথ মালিক, বিজেপির অরুণ হালদার, সিপিএমের সমর হাজরা ও জাতীয় কংগ্রেসের রাজীব সাহা।
তবে ২০১১ সালে এই কেন্দ্রে জয়ী হন তৃণমূলের প্রার্থী উজ্জ্বল প্রামাণিক। ২০১৬ সালে আবার তৃণমূলের হাত থেকে জামালপুর ছিনিয়ে নেয় মার্ক্সবাদী ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী সমর হাজরা। ২০২১-এ এখানে প্রার্থী করা হয় তৃণমূলের অলোক মাঝিকে। তিনি সমরবাবুকে পরাজিত করে জয়ী হন। আর এ বারে প্রার্থী করা হয়েছে ভূতনাথ মালিককে। বিপরীতে সিপিএমের তথা মার্ক্সবাদী ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী সেই সমর হাজরা।
উল্লেখ্য, এই কেন্দ্রে মতুয়া ভোটারের একটি বড় অংশ রয়েছে। SIR পর্ব এবং NRC নিয়ে আতঙ্কে আছেন বহু পরিবার। এর সঙ্গে রয়েছে এই এলাকার বালি খাদেরও গল্প।
যুযুধান লড়াইয়ের এই কেন্দ্রে প্রচার করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সর্বভারতীয় তৃণমূলের সভাপতি অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ও প্রচারে ঝড় তুলেছেন। লাল ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বামেরাও রীতিমতো এ বছর মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
২০১৬ সালের নির্বাচনের পর থেকে সিপিএমের ভোট ধাপে ধাপে কমেছে, বিজেপির ভোট বেড়েছে। কিন্তু এ বার এই কেন্দ্রে মোট ভোটার রয়েছেন ২ লক্ষ ২৫ হাজার ৫৫১জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার রয়েছেন ১ লক্ষ ১৪ হাজার ৩৩১ জন এবং মহিলা ভোটার রয়েছেন ১ লক্ষ ১১ হাজার ২১৫ জন। আর SIR পর্বে বাদ গিয়েছেন প্রায় ৬ হাজারের কাছাকাছি ভোটার।
২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী পেয়েছিলেন ৮৪ হাজার ৪৩৪ ভোট। সিপিএম তথা মার্ক্সবাদী ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রার্থী পেয়েছিলেন ৮১ হাজার ৮৯১ ভোট। বিজেপি পায় মাত্র ৩১০২ ভোট। কিন্তু ২০২১ এর বিধানসভায় তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৯৬ হাজার ৯৯৯, সিপিএমের ২৩ হাজার ২৯৮ এবং বিজেপির ৭৯ হাজার ২৮টি ভোট পায় ।
পুরোনো রেজাল্ট তুলে ধরে সিপিএম প্রার্থী সমর হাজরা দাবি করে বলেন, ‘২০১৬ সালে জামালপুর কেন্দ্রে তখনও বামেদের ছিল দাপট। কিছু ভুল তো হয়েছিল, তাই পরবর্তী সময়ে আমরা হেরে গিয়েছিলাম। কিন্তু এ বার মানুষ বুঝে গিয়েছে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে হবে। তাই এ বার খোওয়া যাওয়া ভোট ফের বামেই ফিরতে চলেছে।’
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী ভূতনাথ মালিক এর দাবি, ‘জামালপুর বিধানসভায় উন্নয়ন হয়েছে। আমাদের সরকার নতুন ব্রিজ করেছে। সেটিও শীঘ্রই চালু হবে। বিরোধীরা অনেক কিছুই বলবে, তাঁদের বলাই কাজ। আমরা এসবে গুরুত্ব দিচ্ছি না। আমরা মানুষকে খালি আমাদের উন্নয়নের কথা বলছি।’ এখানেই শেষ নয়, বিরোধী বাম প্রার্থীকে কটাক্ষ করে ভূতনাথ বলেন, ‘সিপিএম বাংলা থেকে মুছে গিয়েছে। জামালপুরে যিনি প্রার্থী হয়েছেন মানুষ মোটেও তাঁকে চাইছে না। তাঁদেরই লোক নেই, ভোট বাড়বে কী করে!’
অন্যদিকে, বিজেপি প্রার্থী অরুণ হালদারের দাবি, ‘মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভোট দেবে, এ বার বাংলায় সরকার গড়বে বিজেপি, সিপিএম-এর সন্ত্রাস মানুষ দেখেছে আর তৃণমূলের দুর্নীতির সাক্ষী তাঁরা। এরা সব এক। এদের দুর্নীতি রুখতে বিজেপি তাই সরকার আসছে।’ জামালপুরের মাটিতে কোন পতাকা উড়বে তা ৪ মে ইভিএম খোলার পরে জানা যাবে।