দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার চারটি বিধানসভা (Assembly Election 2026) কেন্দ্রের পুলিশ অবজ়ার্ভারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে IPS অফিসার পুরুষোত্তম দাসকে। প্রথম থেকেই তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূল। তাঁর বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ তুলে কমিশনেরও দ্বারস্থ হয়েছে। এর মধ্যেই ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নতুন অভিযোগ সামনে এল। রবিবার রাতভর ফলতার বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ ও তৃণমূল কর্মীদের বাড়িতে CRPF অভিযান চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। তৃণমূল নেতাদের একটা অংশের দাবি, একই রকম অভিযান হয়েছে মগরাহাট পূর্বেও। অভিযোগ, মাঝরাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে কড়া নেড়েছেন জওয়ানরা। কিছু ভিডিয়োয় পুলিশকেও দেখা গিয়েছে (ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি এই সময় অনলাইন)। এমন ঘটনায় আতঙ্কে সিঁটিয়ে গিয়েছেন সাধারণ মানুষ। অহেতুক হেনস্থা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। তৃণমূলের দাবি, সবটাই হয়েছে পুলিশ অবজ়ার্ভারের নির্দেশে। যদিও কমিশনের দাবি, এই রকম কোনও অভিযান চলছে না। এখনও অবধি পুলিশ অবজ়ার্ভারের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হয়নি।
এই পুলিশ অবজ়ার্ভারের ভূমিকা নিয়েই রবিবার ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন ডায়মন্ড হারবারের তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মগরাহাটের সভা থেকে অভিষেক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘বিজেপি প্রার্থী ৫–৬ জনকে নিয়ে পুরুষোত্তম দাসের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছিলেন। ভেবেছিলেন চুপি চুপি বৈঠক করবেন, কেউ জানতে পারবেন না। এখানে আকাশে, বাতাসে, মাটিতে, জেটিতে, লতায়–পাতায় আমি রয়েছি। পালাবেন কোথায়? সব ফাঁস করে দিয়েছি।’
দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় নির্বাচন কমিশনের যে বিশেষ নজর, তা গত কয়েক দিনের কাজকর্মে বুঝিয়ে দিয়েছে তারা। জেলার এক ঝাঁক পুলিশ অফিসারকে বদলি করা হয়েছে। সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) ডিজি জিপি সিং গত শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ডায়মন্ড হারবারে সিআরপিএফ জওয়ানদের নিয়ে নিজে রুটমার্চ করেছেন।
রবিবার নির্বাচন কমিশনের তরফে মোটরবাইক বাহিনী নিয়ে একটি ভিডিয়ো (তার সত্যতা এই সময় অনলাইন যাচাই করেনি) প্রকাশ করে দাবি করা হয়েছিল, ভোটারদের হুমকি দিতে তৃণমূলের এই বাহিনী শনিবার রাতভর টহল দিয়েছে ডায়মন্ড হারবারে। তবে তৃণমূলের দাবি, শনিবার রাত ১০টা পর্যন্ত ভোটের প্রচারের অনুমতি ছিল। তাদের মোটর বাইক মিছিল চলে ৯টা ৫১- ৯টা ৫২ পর্যন্ত। আর সেই মিছিল থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হয়েছে। যে স্লোগানে বিরোধীরা ভয় পায় বলেও কটাক্ষ করেছে তৃণমূল।
যদিও বাইক বাহিনীর ভিডিয়ো প্রকাশ করে রবিবার নির্বাচনী আধিকারিক ও পুলিশ-প্রশাসনকে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তৃণমূলের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের নির্দেশেই রাতভর মানুষকে ভয় দেখানো হয়েছে। যদিও রাজ্যের CEO দপ্তর সূত্রে খবর, এই রকম কোনও তল্লাশিই হয়নি।
ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খান বলেন, ‘পুলিশ অবজ়ার্ভার নিরপেক্ষ ভাবে কাজ না করে বিজেপির নেতাদের কথায় রাতভর বাড়ি বাড়ি গিয়ে মা, বোনেদের ভয় দেখাচ্ছেন। বাড়ির বয়স্ক লোকজনের রাতের ঘুম কাড়ছেন। তবে ২৯ এপ্রিল মানুষ এর জবাব দেবেন। এই সব করে ওরা নির্বাচন কমিশনের সম্মান নষ্ট করছে।’
যদিও বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাসের (ববি) বক্তব্য, ‘শুধু ফলতা কেন, ডায়মন্ড হারবার জুড়ে অভিযান চালালে দু’জাহাজ অস্ত্র বেরোবে। আমি তো আগেও বহু বার বলেছি। এখন নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী সক্রিয়। লোকসভা ভোটের সময়ে হয়নি কেন?’ জেলার সিপিএম নেতা সাম্য গঙ্গোপাধ্যায় দাবি করেন, মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে তা কমিশনকে নিশ্চিত করতেই হবে।
পুরুষোত্তম দাসের বিরুদ্ধে পক্ষপাতপূর্ণ আচরণের অভিযোগ তুলে আগেই কমিশনেও অভিযোগ করেছিল তৃণমূল। এ নিয়ে হাইকোর্টে মামলাও হয়। যদিও ইসি–র আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন, ওই পুলিশ অবজ়ার্ভার নিরপেক্ষ ভাবেই কাজ করেছেন। কিন্তু আদালত এতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয়নি।
পুলিশ অবজ়ার্ভারের সঙ্গে বিজেপি নেতাদের মিটিং নিয়ে পুলিশ তদন্ত শুরু করার পরে কেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক ঝাঁক পুলিশ অফিসারকে বদলি করা হলো, সেই প্রশ্নও তুলেছেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। রবিবারের সভা থেকেই অভিষেক বলেছেন, ‘পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে বলে ডায়মন্ড হারবারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এসডিপিও, উস্তি থানার ওসি, ডায়মন্ড হারবারের ওসি, ফলতার আইসি-কে চেঞ্জ করেছে কমিশন। চোর চুরি করেছে, পুলিশ তাকে ধরেছে বলে পুলিশের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হলো! পাঁচ জন অফিসার চেঞ্জ করে ওরা ভেবেছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জব্দ করবে।’ এই প্রেক্ষাপটে রবিবার নতুন অভিযোগ উঠল ফলতায়।
তৃণমূল এই ঘটনায় আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, অভিযুক্তরা যে রাজ্যেরই হোন, যে রাজনৈতিক দলেরই মদত থাকুক, আইনের মুখোমুখি হতেই হবে।