২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসার পরে কলকাতাকে ‘লন্ডন’ বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৫ বছর পরে নাম না করে তাঁর সেই প্রতিশ্রুতিকেই কটাক্ষ করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর কথায়,‘কলকাতাকে লন্ডন নয়, কলকাতাই তৈরি করতে হবে।’ ছাব্বিশের প্রচার লগ্নের শেষ সভায় শাসকদল তৃণমূলের স্লোগান নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিলেন তিনি। সিপাই বিদ্রোহের স্মৃতি বিজড়িত ব্যারাকপুরের জগদ্দলের মঞ্চ থেকে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের রূপরেখা এঁকে দিলেন তিনি। একইসঙ্গে আত্মবিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রীর দাবি, ‘বাংলার মেজাজ বলছে, এ বার পদ্ম ফুটছেই। অঙ্গ, কলিঙ্গের পরে এ বার বঙ্গে পদ্ম ফোটার পালা। নিশ্চিন্তে থাকুন, এর পরে ৪ মে-র পর বিজেপি সরকারের শপথে আমি আসবই।’
২৬-এর নির্বাচনের দ্বিতীয় দফা ও অন্তিম ভোট পর্বের আগে শেষ প্রচার সভায় এসে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সভা শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক প্রধানমন্ত্রী। অমিত শাহের পরে এ বার মোদীর প্রচারেও তিলোত্তমার উল্লেখ। শহরতলির মঞ্চ থেকেই কলকাতার পরিচয় বাঁচাতে জনগণকে পদ্ম চিহ্নে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানালেন তিনি। নাম না করা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলকাতাকে লন্ডন বানানোর স্বপ্নকে কটাক্ষ করে মোদী বলেন,‘কলকাতাকে অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। TMC কলকাতাকে লন্ডন বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু, গত ১৫ বছরে তাদের মদতে এই শহরে ভরে গিয়েছে অনুপ্রবেশকারীতে। তাদের আশ্রয় দিয়েছে তৃণমূল। শহরের পরিচয় বাঁচাতে আমাদের একত্রে কাজ করতে হবে। কলকাতাকে লন্ডন নয়, কলকাতাই তৈরি করতে হবে।’ গঙ্গাপারের এই শহরকে নিয়ে একাধিক পরিকল্পনার কথাও শোনালেন নরেন্দ্র মোদী। তাঁর কথায়, ‘কলকাতাকে ঢেলে সাজাতে সুগঠিত পরিবহণ ব্যবস্থা দরকার। কলকাতা মেট্রোর দ্রুত বিস্তারের জন্য বিজেপিকে ভোট দিন। সিটি অফ জয় একুশের শতকে সিটি অফ ফিউচার করার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।’
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শহরকে লন্ডন বানানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। হুগলি নদীকে কেন্দ্র করে লন্ডনের টেমস নদীর আদলে কলকাতার সৌন্দর্যায়ন এবং উন্নয়ন করার কথা বলেছিলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে ২০২৩ সালে ধর্না মঞ্চ থেকে মমতা দাবি করেছিলেন, তাঁর সরকারের শাসনকালে কলকাতাকে লন্ডনের থেকেও সুন্দর ও ভালো করে তোলা হয়েছে। সে সময়ে তিনি দাবি করেন, ‘লন্ডনে একটা হাইড পার্ক ও শুধু কয়েকটি চিপসের দোকান রয়েছে। আমি নিজে হেঁটে দেখে এসেছি। আর আমাদের ইকো ট্যুরিজ়ম পার্কটি গিয়ে দেখে আসুন।’ তবে ২০১৫ সালে সাক্ষাৎকারে তিনি লন্ডন ও কলকাতার তুলনা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন, কলকাতার ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে একে পুরোপুরি লন্ডনের মতো করা সম্ভব নয়।
এ দিন প্রধানমন্ত্রী মোদী তৃণমূলের ‘মা-মাটি-মানুষ’ স্লোগান নিয়েও কটাক্ষ করেন। এ দিনের সভা থেকে তিনি বলেন,‘এ বার ভোটে এক বারও মা-মাটি-মানুষের কথা বলেনি তৃণমূল। যে স্লোগান নিয়ে সরকার গড়েছিল, আজ তাই ভুলে গিয়েছে। ১৫ বছরের উন্নয়নের কোনও রিপোর্ট কার্ড দেখাতে পারেনি। ১৫ বছর ওদের সুযোগ দিয়েছেন, কিন্তু ওরা নিজেদের স্লোগান ভুলে মায়ের জন্য, নারী সুরক্ষার জন্য কিছু করেনি। মাটি, কৃষক, যুবক, মানুষের জন্যেও কিছু করেনি। প্রচারে উন্নয়ন নিয়ে কিছু বলার নেই বলে, একটাই ফর্মুলা নিয়েছে, গালি দাও, হুমকি দাও, মিথ্যা বলো। মোদীকে, সেনাকে গালি দিয়েছে। বাংলার লোকজনকে হুমকি দিয়েছে।’ এখানেই শেষ নয়, তাঁর দাবি, ‘বাংলার মানুষের ভবিষ্যতের জন্য তৃণমূলের কাছে কোনও রূপরেখা নেই। কী করা হবে, কোথায় নিয়ে যাবে, তা-ও বলে না তৃণমূল। কারণ ওদের কোনও ইচ্ছা নেই, দূরদর্শিতা নেই।’
ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের বর্তমান অবস্থা থেকে রাজ্যে চাকরি-কর্মসংস্থানের ‘দুর্দশা’র কথা তুলে ধরে শাসক দলকে কটাক্ষ করার পাশাপাশি বাংলার তরুণ-তরুণীদের জন্য একাধিক প্রতিশ্রুতি দেন। তাঁর কথা অনুযায়ী, বিজেপি সরকারে এলেই সপ্তম বেতন কমিশনের সুরক্ষা পাবেন সরকারি চাকুরিজীবীরা। স্কুলে স্কুলে কনটেন্ট ক্রিয়েশনের কোর্স, বাংলায় ১২৫ দিন রোজগারের গ্যারান্টি, মাছ ব্যবসায়ীদের রোজগার বৃদ্ধির আশ্বাস, হকারদের জন্য PM স্বনিধি যোজনার কথাও ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।
অঙ্গ, কলিঙ্গের পরে এ বার বঙ্গে পদ্ম ফোটার ব্যাপারে নিশ্চিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তাঁর কথায়, ‘বাংলায় এ বার অন্যরকম হাওয়া। এত দিন ধরে এত গরমে প্রচার করছি, এত ভিড়, তবু আমার কোনও ক্লান্তি নেই। কেন জানেন? আসলে এটা আমার কাছে এটা তীর্থযাত্রার মতো পবিত্র। এখানকার মানুষের এত স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া, সবার মনোভাব বলে দিচ্ছে, এ বার বাংলায় পরিবর্তন হচ্ছেই। ক্ষমতায় আসছে বিজেপি।’ সভার শেষে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর উদ্ধৃতি উল্লেখ করে মোদী আবারও জনতার কাছে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানান।