• মুখ্যমন্ত্রীর ‘চামার’ মন্তব্যে বিতর্ক, চামার আসলে কারা, কেন আপত্তি তফসিলি জাতি কমিশনের?
    আজ তক | ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • Mamata Banerjee Remark: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্কের ঝড় রাজ্য রাজনীতিতে। তফসিলি জাতি কমিশন (NCSC) ইতিমধ্যেই স্বতঃপ্রণোদিতভাবে পদক্ষেপ করেছে। রাজ্য সরকারের কাছে তিন দিনের মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। অভিযোগ, নির্বাচনী সভায় ‘চামার’ শব্দ ব্যবহার করে তফসিলি জাতি সম্প্রদায়কে অপমান করা হয়েছে। এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই প্রশ্ন উঠছে; ‘চামার’ কারা? কেন এই শব্দ ব্যবহার এত স্পর্শকাতর?

    ২৩ এপ্রিল কলকাতার চৌরঙ্গিতে একটি নির্বাচনী সভায় তৃণমূল প্রার্থী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের একটি অংশ ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত। ২৬ এপ্রিল নয়াদিল্লি থেকে প্রকাশিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তফসিলি জাতি কমিশন জানায়, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতেই তারা এই বিষয়ে suo motu পদক্ষেপ নিয়েছে। কমিশনের মতে, নির্বাচনী প্রচারে এই ধরনের শব্দ ব্যবহার শুধু আপত্তিজনক নয়, এটি তফসিলি জাতি ও উপজাতি (অত্যাচার প্রতিরোধ) আইনের ৩(১)(এস) ধারার অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

    কিন্তু ‘চামার’ শব্দটি কেন এত স্পর্শকাতর?
    সমাজতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, ‘চামার’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘চর্ম’ থেকে, যার অর্থ চামড়া। ঐতিহাসিকভাবে এই সম্প্রদায়ের মানুষ চামড়া সংক্রান্ত কাজ, যেমন জুতো তৈরি বা চর্মশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই থেকেই ‘চর্মকার’ বা ‘চামার’ পরিচয় তৈরি হয়।

    নৃতাত্ত্বিক গবেষক জি. ডব্লিউ. ব্রিগস ১৯২০ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘The Chamars’ বইতে এই সম্প্রদায়ের সামাজিক কাঠামো, জীবনযাত্রা ও পেশাগত অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সেই গবেষণা অনুযায়ী, ভারতীয় সমাজে দীর্ঘদিন ধরে এই সম্প্রদায়কে নিম্নবর্ণ বা ‘ডিপ্রেসড ক্লাস’ হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার ইতিহাসও দীর্ঘ।

    সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, চামার সম্প্রদায় বর্তমানে তফসিলি জাতি বা দলিত হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু অতীতে ‘অস্পৃশ্যতা’র সঙ্গে তাদের নাম জড়িয়ে গিয়েছিল। এই কারণে ‘চামার’ শব্দটি অনেক ক্ষেত্রে অবমাননাকর অর্থে ব্যবহৃত হত। সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটই এই শব্দকে আজও সংবেদনশীল করে রেখেছে।

    নেপালের তরাই অঞ্চলেও এই সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। বিভিন্ন জনগণনা অনুযায়ী, সেখানে তারা দলিত সমাজের একটি বড় অংশ। সমাজতাত্ত্বিক ত্রিভুবন চন্দ্র ওয়াগলের মতে, হিন্দু বর্ণব্যবস্থায় চামারদের অবস্থান নিচের দিকে ছিল। এমনকি দলিত সমাজের মধ্যেও একেবারে নিম্নস্তর মনে করা হত তাঁদের। আইনতভাবে বৈষম্য নিষিদ্ধ হলেও, বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে সামাজিক দূরত্ব এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি।

    এহেন প্রেক্ষাপটে তফসিলি জাতি কমিশনের বক্তব্য, নির্বাচনী মঞ্চে এমন শব্দ ব্যবহার পরিস্থিতি সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। 

    সব মিলিয়ে, একটি শব্দের ব্যবহার কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে, এই ঘটনাই তার সাম্প্রতিক উদাহরণ। 
  • Link to this news (আজ তক)