এই সময়: ভোটের বাংলায় গত দেড় মাসে অন্তত দেড় ডজন সভা–মিটিং–রোডশো করেছেন তিনি। বঙ্গে হালফিলের যে কোনও নির্বাচনে অন্তত এত বার ছুটে বেড়াননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু তিনি নিজে বলছেন, এই ছোটাছুটিতেও তাঁর ক্লান্তি আসেনি। কারণ, বাংলায় এ বার তাঁর এই ছুটে বেড়ানোটা ছিল ‘তীর্থযাত্রা’র মতো। এখানেই শেষ নয়। মোদী আত্মবিশ্বাসী, এ বার বাংলায় সরকার গড়ছে বিজেপিই। বাংলার কোনও বিজেপি নেতাই বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসতে চলেছেন। তাই ৪ মের পরে তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে কলকাতায় আসার পরিকল্পনাও শুরু করে দিয়েছেন নমো। যদিও প্রধানমন্ত্রীর এই আশা পূরণ হবে না বলে পাল্টা খোঁচা দিতে দেরি করেনি রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল। জোড়াফুলের দাবি, চতুর্থবারের জন্য রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এ দিনই আবার ৪ মের জন্য এখন থেকেই সবুজ আবির কিনে মজুত করার ডাক দিয়েছেন।
সোমবার ব্যারাকপুরের নির্বাচনী সভা থেকে মোদী বলেন, ‘এ বারের ভোটে এটাই আমার শেষ সভা। এই বিশ্বাস নিয়ে ফিরে যাচ্ছি, ৪ মে ফল ঘোষণার পরে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আমি আসছি–ই।’ এ দিন ব্যারাকপুরের এই সভা থেকে নমো বাংলায় ভোট প্রচারে তাঁর এতদিনের অভিজ্ঞতা তুলে করেন। প্রধানমন্ত্রীর দাবি, বিজেপি প্রার্থীদের জন্য ভোট চেয়ে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে তিনি যে রোড–শোগুলি করেছেন, সেগুলি নিছক কোনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল না। মোদীর ব্যাখ্যা, সেগুলিকে তিনি তীর্থযাত্রা হিসেবে ভাবছেন। নিজের রাজনৈতিক জীবনের গতিপ্রকৃতির কথা টেনে মোদী বলেন, ‘গত তিন–চার দশকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়েছি। পার্টি আমাকে যখন যে কাজ দিয়েছে, করেছি। পরিবার ছাড়ার পরে দেশের সাধারণ মানুষই আমার পরিবার। সব আনন্দ সেখানেই।’ তাঁর সংযোজন, ‘এত ছোটাছুটিতে পরিশ্রম হবে। ক্লান্তি আসবে। এটাই স্বাভাবিক।’ কিন্তু নমোর দাবি, বাংলার ঠা ঠা রোদে দিনের পর দিন প্রচার করেও তিনি এতটুকু ক্লান্ত হননি। তার কারণও এ দিন ব্যাখ্যা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। নমোর কথায়, ‘বাংলায় অনেক রোড–শো করেছি, জনসভা করেছি। তবে এগুলি আমার কাছে কোনও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়। এ সব আমার জন্য তীর্থযাত্রার মতো ছিল।’ এখানেই শেষ করেননি মোদী। বাংলার এ বারের ভোটপ্রচার তাঁর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝাতে অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনের উদাহরণও এ দিন টেনেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘২০২৪–এর জানুয়ারিতে অযোধ্যায় রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছিল। তার আগে আমি ব্রত রেখেছিলাম। দক্ষিণ ভারতের অনেক মন্দিরেও গিয়েছিলাম। এই ভোটেও আমার সে রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে, যে রকম অনুভূতি কোনও মন্দিরে গেলে হয়।’
একইরকম আত্মবিশ্বাসী রাজ্যের শাসক শিবিরও। ক্ষমতায় আসা নিয়ে কোনও সংশয় নেই তৃণমূল নেতৃত্বের মধ্যেও। এ দিন হুগলির ধনেখালির সভা থেকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্লোগান তোলেন, ‘জেনে গেছে জনতা, চার তারিখ ক্ষমতায় আসছে মমতা।’ তাঁর খোঁচা, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলার মানুষকে নানা রকম গ্যারান্টি দিচ্ছেন। ভিন রাজ্যের বিজেপি নেতারা কি ২৯ তারিখের পরে বাংলায় থাকবেন? সবাই কিন্তু রিটার্ন টিকিট কেটেই এসেছেন।’ তৃণমূল নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাসে যে কোনও খাদ নেই, সেটা বোঝাতে এ দিন রাত পৌনে ১০টা নাগাদ এক্স হ্যান্ডলে অভিষেক লেখেন, ‘বাজারে যত সবুজ আবিরের প্যাকেট পাবেন, সব কিনে নিন। মজুত করে রাখুন। কারণ, ৪ মে সবুজ আবিরের ব্যাপক টান পড়বে। গোটা রাজ্য সে দিন সবুজ হয়ে উঠবে। বাংলার প্রতিটা কোণ থেকে ভেসে আসবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর। আর হ্যাঁ, সাথে একটু ডিজেও চলবে। প্রস্তুত হয়ে যান।’ তাঁর সংযোজন, ‘উদযাপন আমাদের মনে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। শুধু রাজপথের সেই মিছিলে সামিল হওয়ার অপেক্ষা।’ শপথগ্রহণ সংক্রান্ত মোদীর ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যকে নিশানা করে তৃণমূল নেতা ফিরহাদ হাকিম বলেন, ‘সে গুড়ে বালি। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ হচ্ছে না। মোদীর উচিত প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারের সম্মান রাখা।’
এ বারের ভোট প্রচারে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিজের বহু পোর্ট্রেট উপহার পেয়েছেন মোদী। ব্যারাকপুরের সভা থেকে তাঁর দাবি, ‘সভা শেষ করতে যত দেরিই হোক না কেন, আমি প্রতিদিন রাতে ওই ছবিগুলি দেখি। আমাকে বাংলার অনেকে চিঠি লেখেন। সেগুলি পড়ি।’ তবে তৃণমূলের দাবি, ঝালমুড়ি পর্ব অথবা গঙ্গায় নৌকোবিহারের মতো মোদীর এই ভাষণও স্ক্রিপ্টেড। দিল্লি পৌঁছে এ দিন রাতে নমো একটি অডিয়ো বার্তাও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছেন বঙ্গবাসীর উদ্দেশে। সেখানেও তিনি বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদলের আহ্বান জানিয়েছেন। অডিয়ো বার্তায় মোদী বলেন, ‘কৃষক হোক, শ্রমিক হোক অথবা বাংলার যুব সমাজ— সবাই এগিয়ে যেতে চায়। তাই পরিবর্তন করতেই হবে। এটাই সবার সংকল্প হোক। এখন আর ভয় নয়। বিজেপিকে চাই বন্ধুগণ।’