এই সময়: প্রথম দফার ভোটের আগে যেটা দেখা যায়নি, ঠিক সেটাই দেখা যাচ্ছে বঙ্গে দ্বিতীয় দফার ভোটের ২৪ ঘণ্টা আগে। হুগলির আরামবাগ, গোঘাট থেকে শুরু করে পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলী, উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দল, হালিশহর— দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে রবিবার রাত থেকে সোমবার দিনভর কোথাও শাসক ও বিরোধী দলের সংঘাত, কোথাও বা ভোটারদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠল। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবারে রাজ্যের শাসকদলের কিছু নেতা–কর্মীর বিরুদ্ধে আবার বাইক মিছিল করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় দফায় রাজ্যের সাতটি জেলায় ১৪২টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ ও হিংসামুক্ত ভাবে ভোট পরিচালনা বড় চ্যালেঞ্জ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে। ফলে ভোটের আগে গোলমাল পাকাতে পারে, এমন সব দুষ্কৃতী বা ট্রাবল মেকারকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিশন সূত্রের খবর, সোমবার সন্ধে পর্যন্ত শুধুমাত্র গত ৩৬ ঘণ্টাতেই ভোটমুখী জেলাগুলি থেকে ১৫৪৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই সংখ্যাটা আরও অনেকটা বাড়তে পারে।
দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে অশান্তি কেন?
রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়ালের ব্যাখ্যা, ‘প্রথম দফার ভোটের জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনীর বড় অংশ চলে গিয়েছিল। সেই সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতীরা কিছু এলাকায় অশান্তি তৈরি করে। রবিবার রাত থেকে বাহিনী ফিরে আসতে শুরু করেছে। তারপরেই অ্যাকশন শুরু হয়েছে।’ সিইও–র সতর্কবার্তা, ‘যাঁরা গোলমাল করছেন, তাঁরা মনে রাখবেন, এভরি অ্যাকশন হ্যাজ় অপোজি়ট অ্যান্ড ইকোয়্যাল রিঅ্যাকশন’।
কমিশন সূত্রের দাবি, এই দফায় চ্যালেঞ্জটা একটু অন্য রকম। কলকাতা, হাওড়া, ব্যারাকপুরের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় জনসংখ্যা বেশি। তাই শুধু ট্রাবল মেকারদের গ্রেপ্তারি নয়, গত বিভিন্ন ভোটে যে সব জায়গায় ভোটের দিন গোলমালের অতীত ইতিহাস আছে অথবা সম্প্রতি যে সব জায়গায় ভোটারদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, সেখানে কমিশনের পুলিশ পর্যবেক্ষকরা নিজেরা কেন্দ্রীয় বাহিনী ও স্থানীয় পুলিশকে নিয়ে অভিযান চালাচ্ছেন। এত কিছুর পরেও যাতে ভোটের দিন কোনও ভাবে হিংসা, বোমাবাজি, ছাপ্পার অভিযোগ না–ওঠে, তার জন্য পুলিশ–প্রশাসনকে আরও কড়া সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। কলকাতার ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রটি অতিস্পর্শকাতর হিসেবে চিহ্নিত করেছে কমিশন। কলকাতায় সর্বাধিক কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং কিউআরটি থাকছে। এ ছাড়াও ৮০টি মোটরবাইক নিয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজ্য পুলিশ টহল দেবে।
বিভিন্ন স্তরের ভোটকর্মী সমেত পুলিশ–প্রশাসনের আধিকারিকদের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, যদি যাবতীয় সতর্কতার পরেও ছাপ্পা, রিগিং, সন্ত্রাসের অভিযোগ ওঠে, তা হলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। দ্বিতীয় দফার ভোটে কোথাও ভুয়ো ভোট বা রিগিং–ছাপ্পার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হবে। অভিযুক্ত আধিকারিকদের গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হতে পারে। কমিশনের এক কর্তার হুঁশিয়ারি, ‘এমন ক্ষেত্রে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ও জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুসারে এমন ধারায় মামলা দায়ের করা হবে, যাতে অভিযোগ প্রমাণে অন্তত এক বছর জেলে থাকতে হয় সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের। পাশাপাশি আদালতেও ওই সিসিটিভি ফুটেজ জমা দিয়ে অভিযোগ দায়ের করা হবে।’
কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে ভোটের সংস্কৃতির বদলের যে লড়াই কমিশন শুরু করেছে, তা জারি থাকবে। চমকে ধমকে এই লড়াইকে থামানো যাবে না।’ সিইও–র কথায়, ‘জেলা সফরে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রত্যেকে বলেছেন, ভোট চুরি হোক, কেউ চান না। প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফাতেও সবাই সতর্ক আছেন। যত বড় মস্তান আসুক, ওষুধ আমাদের কাছে রয়েছে।’ কমিশন সূত্রের খবর, এ দিন দুপুর পর্যন্ত ভোটমুখী জেলাগুলি থেকে প্রায় ২৩০০ অভিযোগ এসেছে। এর বেশিরভাগই হুমকি, ভয় দেখানো ইত্যাদি সংক্রান্ত। এ সব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুলিশ–প্রশাসনকে পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভোটমুখী জেলার ডিইও–দের বলা হয়েছে, এই সব এলাকার হোটেল, গেস্টহাউস, ধর্মশালা বা বড় হাউজ়িংয়ে কোথাও বহিরাগতরা জড়ো হয়ে থাকছে কি না, তার উপরে নজরদারি চালাতে হবে।
এই দফার ভোটে বুথের ভিতর–বাইরে এবং আশপাশের সংকীর্ণ রাস্তা ইত্যাদি এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংরক্ষণের উপরেও বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে কমিশন। ভোট শেষে বুথে বসানো ওয়েব ক্যামেরা খুলে আনা এবং তাতে থাকা তথ্য সংরক্ষণ নিয়ে নতুন নির্দেশিকাও জারি করেছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও)। ভোটকর্মীরা বুথ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরে বুথে উপস্থিত থাকবেন বিএলও, কেন্দ্রীয় বাহিনী, পুলিশ কনস্টেবলরা। তাঁদের দায়িত্ব হবে বুথে বসানো ওয়েব ক্যামেরাগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সেক্টর অফিসারদের উপস্থিতিতে ক্যামেরাগুলি খুলে রিসিভিং সেন্টারে জমা দিতে হবে। এর কোনও অন্যথা হলে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে বলেও জানিয়েছে কমিশন।