• চেনা অনেকের নাম ডিলিটেড, মন ভালো নেই 'কবিতাওয়ালা'র
    এই সময় | ২৮ এপ্রিল ২০২৬
  • গৌতম ধোনি, কৃষ্ণনগর

    'যদি নির্বাসন দাও। আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরী ছোঁয়াবো, আমি বিষপান করে মরে যাবো...।' চলতি সময়ের নিরিখে 'নির্বাসন' মানে কি ডিটেনশন ক্যাম্প? ভোটের বাজারে এই প্রশ্ন কুরে কুরে খাচ্ছে 'কবিতাওয়ালা'কেও। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন আউড়ে সেই উপলব্ধিই ব্যক্ত করছেন তিনি।

    নদিয়ার অজ পাড়াগাঁয়ে বাড়ি হলেও সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে 'কবিতাওয়ালা' কে এখন চেনেন বাংলা ভাষাভাষী অনেকেই। আসল নাম আজিবর মণ্ডল। পেশায় চাষি, নেশায় কবি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন তাঁর ফলোয়ার তিন লক্ষ সতেরো হাজারের বেশি। নিজেদের কলা বাগান, পটল খেত বা পাট জমিতে কাজ করতে করতেই জীবনানন্দ, সুনীল, শক্তি, জয় সহ বিখ্যাত কবিদের কবিতা প্রায়শই আবৃত্তি করে শোনান আজিবর। কখনও লিটল ম্যাগের নিজের পছন্দের কোনও কবি, কখনও আবার নিজের লেখা কবিতাও আবৃত্তি করেন তিনি। বাচনভঙ্গি বেশ মনকাড়া। গ্রামে তাঁর পরিচিত কয়েক জনের নাম ভোটার তালিকায় 'ডিলিটেড'। সেই মানুষগুলো কি 'নিবাসন' আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে আছেন। সুনীলের কবিতা আউড়ে সেই প্রশ্নই করছেন 'কবিতাওয়ালা'।

    নদিয়ার উত্তর প্রান্তে নন্দনপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কিশোরপুর গ্রামে বাড়ি আজিবরের। ২০০০-এ উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পরে কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু দুই দাদাকে চাষের কাজে হাতে হাতে সাহায্য করতে প্রথম বর্ষেই পড়া ছাড়তে বাধ্য হন। এখনও সেই যৌথ পরিবারেই থাকেন। বছর পঁয়তাল্লিশের আজিবর এখন অবশ্য অভিজ্ঞ চাষি। মাথায় গামছা জড়িয়ে সকাল সকাল মাঠে চলে যান। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ফসল ফলানোর ফাঁকেও নিজের মনে লুকিয়ে রাখা কবিতা-প্রেমকে মরতে দেননি। দু'বেলা জমিতে আসার সময়ে কাস্তে, সারের ঝুড়ি ও অন্য কৃষি সরঞ্জাম ইত্যাদি যেমন নেন, একই সঙ্গে নিতে ভোলেন না খাতা-পেন আর মোবাইল। মাথায় গামছা বেঁধে কোনও দিন কলাতলায় বসে, কোনও দিন পটল বা পাট খেতে দাঁড়িয়ে পছন্দের কবির কবিতা আবৃত্তি করেন। আর তার পরে সেই ভিডিয়ো পোস্ট কারেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।

    আজিবর বলেন, 'বহু বাসিন্দাকেই বে-নাগরিক করার চেষ্টা হচ্ছে। আমি অবাক হচ্ছি এই ভেবে যে, আজকের এই পরিস্থিতির কথা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেন কত দিন আগে অনুভব করে গিয়েছেন। যাঁদের নাম ডিলিটেড হয়েছে, তাঁদের মনে এখন একটাই আতঙ্ক, ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে না তো?'

    গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা 'সার'-এর খসড়া তালিকায় দেখা গিয়েছিল শুধু নদিয়া জেলাতেই প্রায় ২ লক্ষ ১৬ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। শুনানি পর্ব চলার পরে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হলে দেখা যায় আরও ৬২ হাজার নাম বাদ গিয়েছে। এ ছাড়াও যে ২ লক্ষ ৬৭হাজার ভোটারের নাম বিবেচনাধীন ছিল, সেখান থেকেও ২ লক্ষ ৮ হাজার (প্রায়) নাম বাদ গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। অর্থাৎ জেলায় সব মিলিয়ে (তিন দফায়) প্রায় ৪ লক্ষ ৮৬ হাজার ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে।

    এ সব তথ্য জেনে মন ভালো নেই 'কবিতাওয়ালা'র। বলছেন, 'আমাদের বাড়ির কাছে বাঁশের মাচায় বসে অবসরে আড্ডা দিই। নাম বাদ গিয়েছে বলে পেশায় পরিযায়ী শ্রমিক আমার এক বন্ধু এ বারের ভোটের সময়ে বাড়ি আসছে না। সেই বন্ধুর নাম বদলে ওকে নিয়েও একটা কবিতা লিখেছি।' দু'লাইন আওড়ালেন কবিতাওয়ালা, 'একথা সেকথার পর ভোলা বলল। হ্যাঁ রে মায়ের নামটা।। একটু রইলাম চুপ করে। তারপর বললাম, হ্যাঁ ডিলিট হয়েছে।'

  • Link to this news (এই সময়)