এই সময়, দুর্গাপুর: ১৯ নম্বর জাতীয় সড়কের পানাগড় বাইপাস ধরে এগোলেই চোখে পড়ে একটি বিশাল তোরণ। তার পিলারে লেখা ‘বেঙ্গল মিন্স বিজ়নেস’। পানাগড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ভিতরে ঝকঝকে ডাবল লেনের রাস্তা, আধুনিক আলোকস্তম্ভ আর সার সার ছোট–বড় কারখানা। পণ্যবাহী ট্রাকের আনাগোনা আর ব্যস্ত কর্মীদের দেখে এলাকার বেকার যুবকরা স্বপ্ন দেখেছিলেন, ঘরের খেয়ে ঘরের পাশেই এ বার কাজ মিলবে। কিন্তু সেই আশায় কার্যত জল ঢেলেছে বঞ্চনার অভিযোগ। পানাগড় শিল্পতালুককে কেন্দ্র করে দানা বাঁধা এই ক্ষোভই এখন গলসি বিধানসভা কেন্দ্রের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অত্যাধুনিক এই শিল্পতালুক গড়ার সময়ে জমিদাতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখা হয়নি। পানাগড়ের বাসিন্দা প্রকাশ দাসের মতো জমিদাতারা আক্ষেপের সুরে জানাচ্ছেন, সস্তায় জমি দেওয়ার সময়ে বলা হয়েছিল পরিবার পিছু অন্তত একজন চাকরি পাবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কারখানায় নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় বা জমিদাতাদের কোনও সুযোগই দেওয়া হয়নি। বাসিন্দাদের দাবি, কারখানায় দক্ষ কর্মীরা বাইরে থেকে আসুক তাতে আপত্তি নেই, কিন্তু অদক্ষ বা সাধারণ শ্রমিকের কাজে কেন ব্রাত্য থাকবেন স্থানীয়রা?
এই বঞ্চনার নেপথ্যে উঠে আসছে এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। অভিযোগের আঙুল কাঁকসা ব্লকের একাংশ তৃণমূল নেতার দিকে। স্থানীয়দের দাবি, নেতাদের ‘সিন্ডিকেট’ শুধু নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করেই ক্ষান্ত থাকেনি, মোটা টাকার বিনিময়ে বহিরাগতদের কারখানায় কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছে। যদিও শিল্পতালুকের আউশগ্রাম ব্লকের অংশে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার গ্যাস বটলিং প্লান্ট, সিমেন্ট কারখানা, স্পিরিট কারখানা ও রাসায়নিক সার কারখানায় কিছু স্থানীয় যুবক কাজ পেয়েছেন, কিন্তু কাঁকসা অংশে চিত্রটা একেবারেই উল্টো।
খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রথম দফার ভোটের আগে দুর্গাপুরের জনসভায় দাঁড়িয়ে এই বঞ্চনার কথা স্বীকার করেছিলেন। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। স্থানীয় তৃণমূল নেতা পল্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ও মেনে নিয়েছেন যে, স্থানীয়দের সুযোগ দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সংখ্যাটা নগণ্য।
নিয়োগ নিয়ে এই ক্ষোভের প্রতিফলন দেখা গিয়েছে খোদ রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও। শনিবার গলসির তৃণমূল প্রার্থী অলোক মাঝির সমর্থনে অনুব্রত মণ্ডলের রোড শো-তে স্থানীয়দের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো কম। এ নিয়ে অলোক মাঝির সাফাই, ‘আমি যখন আগে জিতেছিলাম তখন শিল্পতালুক তৈরি হচ্ছিল, মাঝে কী হয়েছে আমার জানা নেই।! অন্য দিকে, এই ক্ষোভকে হাতিয়ার করে আসরে নেমেছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের প্রার্থী রাজু পাত্রের প্রতিশ্রুতি, তাঁরা ক্ষমতায় এলে স্থানীয় ছেলেদের কর্মসংস্থানই হবে প্রথম অগ্রাধিকার।
সব মিলিয়ে, পানাগড়ের ‘বেঙ্গল মিন্স বিজ়নেস’ স্লোগান ছাপিয়ে এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের দাবি। এ বারের নির্বাচনে ইভিএমে এই বঞ্চনার জবাব ভোটাররা দেন কি না, সেটাই এখন দেখার।