প্রশান্ত ঘোষ, ভাঙড়
ভোট মানেই বুথের বাইরে চট পেতে মুড়ি-চানাচুর, বিড়ির ধোঁয়া আর খোশগল্পে রাজনৈতিক দাদাদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠেন প্রান্তিক ভোটাররা। ভাগ্য ভালো থাকলে অনেক জায়গায় জোটে বিরিয়ানির প্যাকেট। ভাঙড়ের সেই চেনা ছবি এ বার অতীত। নির্বাচন কমিশনের কড়া নির্দেশ, ভোটের দিন আর কোনও খাবার বিলি নয়। চলবে না জটলা বা আড্ডা। অশান্তি ঠেকাতে ভাঙড়ে ভেঙে দেওয়া হচ্ছে বহুদিনের ভোটের সংস্কৃতি।
এতদিন ভোট মানেই বুথের সামান্য দূরে চট পেতে বসতেন শাসক ও বিরোধী দলের নেতারা। রাখা থাকত মুড়ি, চানাচুর, বিড়ির প্যাকেট। কপাল ভালো হলে জুটত বিরিয়ানি। এ বার ভোটে চট পেতে খাবার দাবার বিলি করা তো দূরের কথা, এক জায়গায় বসে পাঁচজন বা তার বেশি লোক গল্পও করতে পারবেন না। চটে বসে ভোটার স্লিপ বিলি করা কিংবা তালিকায় ক্রমিক নম্বর দেখে দেওয়া যাবে না। ভাঙড়ে ভোটের অশান্তি বন্ধ করতে এমন কড়া পদক্ষেপ নিতে চলেছে কমিশন। ইতিমধ্যে পুলিশ ও প্রশাসন মহলে সেই বার্তা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে ভোটের চেনা ছবি উধাও হতে চলেছে ভাঙড়ের ৩০২টি বুথ থেকে।
গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভাঙড়ে রাজনৈতিক গন্ডোগোলের জন্য সাতজন খুন হলেও লোকসভা নির্বাচনে ভাঙড়ে কোনও বড় গন্ডগোল হয়নি। হানাহানি, মারামারি, বোমাবাজির শীর্ষে থাকা ভাঙড়ে কী ভাবে শান্তির ভোট করা যায় তা নিয়ে গত কয়েকমাস ধরে ব্যাপক হোমওয়ার্ক করেছেন লালবাজারের শীর্ষ কর্তারা। এ বার অশান্তি রুখতে ভাঙড়ের সাতটি থানার পুলিশ অফিসাররা এলাকার সমস্ত গুন্ডা মস্তানকে ভোটের অনেক আগে থেকেই নজরবন্দি করা শুরু করেছেন। যাদের পুরোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে তাদের অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এলাকা থেকে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। গত তিন মাসে কম করে পাঁচশো বোমা উদ্ধার হয়েছে পোলেরহাট, উত্তর কাশীপুর, বিজয়গঞ্জ বাজার থানা এলাকা থেকে।
এলাকার বেশ কিছু নেতাকে সেন্সর করা হয়েছে। তাঁরা না চাইলেও কলকাতা পুলিশের অফিসাররা তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিনিয়ত ঘুরছেন এবং তাঁদের প্রত্যেকটা মুভমেন্ট থানার ওসিকে জানাচ্ছেন। ভাঙড়ে রক্তপাতহীন ভোট করানোর লক্ষ্যে ১৩টি অঞ্চলের জন্য কম করে ৩০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে চলেছে কমিশন। ভোটের অনেক আগে থেকেই দশ কোম্পানি বাহিনী নিয়মিত ভাঙড়ের বর্ডার এলাকাগুলোয় নাকা তল্লাশি করার পাশাপাশি স্পর্শকাতর এলাকায় টহল দিচ্ছে।
গণ্ডগোল প্রবণ দু-তিনটি গ্রামে নিয়মিত নজরদারি চালাচ্ছেন বাছাই করা অফিসাররা। নিউ টাউন লাগোয়া হাতিশালা আউটপোস্ট, বিজয়গঞ্জ বাজারের কমিউনিটি হলে ফোর্স বাড়ানো হয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন মামলায় জড়িত কুখ্যাতদের ফোনে আড়ি পেতে বোমা উদ্ধার, অস্ত্র উদ্ধার করছে পুলিশ। কয়েকদিন আগে এ ভাবেই এক শার্প শুটারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। লালবাজারের এক কর্তা বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে ভয়মুক্ত অবাধ নির্বাচনের জন্য ইতিমধ্যেই প্রচুর গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে। গলি, মেঠো রাস্তার জন্য প্রচুর বাইকের টহলদারি বাড়ানো হয়েছে। কোথাও পাঁচ জনের বেশি জমায়েত হলেই গ্রেপ্তার করা হবে।’
পুলিশের এমন ব্যবস্থায় শাসক বা বিরোধীরা বিরক্ত হলেও খুশি সাধারণ মানুষ। ভোটের দিন এমন দাবাং মেজাজেই পুলিশকে দেখতে চান ভাঙড়ের সাধারণ ভোটাররা।