বেশি গরমে বাড়বে খরচও, কোন কোন জিনিসের দাম বাড়তে পারে?
আজ তক | ২৯ এপ্রিল ২০২৬
চলতি বছর রেকর্ড গরম পড়তে পারে। দেশের বিভিন্ন জায়গার তাপমাত্রা ছাড়াতে পারে গড়ে ৪৫ থেকে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কোনও সন্দেহ নেই এর জেরে অস্বস্তি বাড়বে। তবে একই কারণে টান পড়বে পকেটেও। কমবে রোজগার, চাকরিও হারাতে পারে কেউ কেউ।
এই সম্ভাবনার কথা জানাচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
এই বিষয়ে infomerics ratings-এর অর্থনীতিবিদ মনোরঞ্জন শর্মা জানান, 'তাপপ্রবাহের দ্বিমুখী প্রভাব পড়তে পারে। শারীরিক ও অর্থনৈতিক। প্রচণ্ড গরম পড়লে সরবরাহ ধাক্কা খাবে। চাহিদা বাড়বে। তার ফলে জিনিসপত্রের দামও বৃদ্ধি পাবে।'
ইলেকট্রিক বিল ইতিমধ্যেই বাড়ছে
তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পিক পাওয়ার ডিমান্ড ইতিমধ্যেই ২৫০–২৫৬ গিগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। এতটা বিদ্য়ুৎ খরচ সাধারণত গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময় দেখা যায়। বিভিন্ন শহরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় এয়ার কন্ডিশনার, কুলার এবং ফ্রিজের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তার জেরে বাড়ছে চাহিদা।
শর্মা বলেন, 'পরিকাঠামোর ওপর চাপ পড়লে সারচার্জ যুক্ত হয়ে খরচ আরও বাড়তে পারে।' তিনি আরও জানান, চাহিদা সরবরাহের তুলনায় দ্রুত বাড়লে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলিকে স্পট মার্কেটে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হয়। আর তার চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের উপর।
খাদ্যশস্যে প্রভাব
তাপপ্রবাহ উৎপানে প্রভাব ফেলে। ২০২২ সালের তাপপ্রবাহে গমের ফলন কমে গিয়েছিল। তার জেরে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হয়েছিল সরকারকে। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, চরম তাপমাত্রা ফসলের ফলন কমায় এবং খাবারের দাম বেড়ে যায়। শর্মা বলেন, 'ফসলের ক্ষতি, কম ফলন এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন খাদ্যের প্রাপ্যতা কমিয়ে দেয়, ফলে দাম বাড়ে।'
উল্লেখ্য, ফল, সবজি ও দুগ্ধজাত পণ্য তাপমাত্রার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। অতিরিক্ত গরমে এগুলি দ্রুত নষ্ট হয়। সংরক্ষণের সময় কমে যায় এবং সরবরাহ কম হয়, ফলে স্থানীয় বাজারে দাম বাড়ে।
পণ্য পরিবহন ও সরবরাহের খরচ বৃদ্ধি
তাপপ্রবাহ শুধু উৎপাদনকেই প্রভাবিত করে না, পণ্য কীভাবে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছায়, সেটাকেও প্রভাবিত করে। কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থায় বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়, পরিবহন প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। দ্রুত নষ্ট হওয়া পণ্যের ক্ষেত্রে দ্রুত ডেলিভারি ও অতিরিক্ত রেফ্রিজারেশনের প্রয়োজন হয়, ফলে প্রতিটি ধাপে লজিস্টিক খরচ বেড়ে যায়।
বিশ্বব্যাঙ্কের একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, চরম তাপমাত্রা সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটায় এবং খাদ্য বিতরণের খরচ বাড়ায়। বিশেষ করে যেসব দেশে কোল্ড-চেইন অবকাঠামো এখনও উন্নয়নশীল। ওই অর্থনীতিবিদ বলেন, 'জ্বালানির অদক্ষতা ও পরিকাঠামোর ওপর চাপের কারণে পরিবহন খরচ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দেয়।'
উচ্চ তাপমাত্রা জ্বালানির দক্ষতা কমিয়ে দেয় এবং যানবাহন ও রাস্তার ওপর ক্ষয়ক্ষতি বাড়ায়, ফলে পরিচালন খরচও বেড়ে যায়। খুচরো বাজারে পণ্য পৌঁছানোর সময় এই সব বাড়তি খরচ দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
উৎপাদন কমিয়ে দেয়
তাপপ্রবাহ শুধু কৃষিক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও উৎপাদনকে প্রভাবিত করে। নির্মাণ, উৎপাদন (ম্যানুফ্যাকচারিং) এবং লজিস্টিকস খাত বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ চরম গরমে কাজের সময় কমে যায় এবং দক্ষতা হ্রাস পায়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-র তথ্য অনুযায়ী, তাপজনিত চাপের কারণে ভারতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ শ্রমঘণ্টা নষ্ট হয়, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের ওপর।
শর্মা বলেন, 'তাপপ্রবাহ শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়, বিশেষ করে নির্মাণ, উৎপাদন এবং লজিস্টিকস খাতে। উৎপাদন কমে গেলেও চাহিদা একই থাকলে দাম বাড়ে।'
এর ফলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। উৎপাদন কমে যাওয়া এবং চাহিদা অপরিবর্তিত থাকায় দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়। তাপপ্রবাহকে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে এই সব চাপ একসঙ্গে বাড়ার প্রবণতা- বাড়তি বিদ্যুতের চাহিদা, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া, লজিস্টিক ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস।