অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: সালটা ১৮৫৯। অধিকার কেড়ে নামমাত্র মূল্য দিয়ে নীলচাষ করানোর বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল নদীয়া। ইতিহাসে যা নীল বিদ্রোহ। আর সেই বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল নদীয়া থেকে মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, যশোর, পাবনা পর্যন্ত। সূত্রপাত হয়েছিল কৃষ্ণনগরের চৌগাছা গ্রাম থেকে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস, দিগম্বর বিশ্বাস, মেঘাই সর্দারের নাম আজও ইতিহাসের পাতায় সমুজ্জ্বল। ১৭০ বছরের পর ফের একবার নদীয়ার মাটি থেকে অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। সেটা হল ভোটাধিকার। এসআইআরের কোপে জেলায় ২ লক্ষেরও বেশি বিচারাধীন ভোটার গণতান্ত্রিক অধিকার হারিয়েছেন। তৃণমূল এই অধিকার হারানোর বিষয়টিকে নীল বিদ্রোহের সঙ্গে তুলনা করে বলছে, সে সময় চাষিদের উল্টোদিকে ছিল ব্রিটিশরা। এখন উল্টোদিকে রয়েছে বিজেপি। ভোটাধিকার হরণের বদলা ইভিএমে নিতে প্রস্তুত নীল বিদ্রোহের মাটি। আর সেটাই চিন্তায় রেখেছে পদ্ম শিবিরকে।
ভোটের আগের দিন কথা হচ্ছিল হাঁসখালির বাসিন্দা গনেশ আধিকারীর সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা সত্ত্বেও ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়েছে বিজেপি। এতদিন আমরা বিজেপিকে ভোট দিয়ে এসেছি। কিন্তু এবার ভোটাধিকার থাকল না। এটা অন্যায়।’ কৃষ্ণনগর লোকসভার সাংসদ তথা কৃষ্ণনগর সাংগঠনিক জেলার তৃণমূলের সভানেত্রী মহুয়া মৈত্র বলেন, ‘মানুষকে বিজেপিকে যেভাবে হয়রানি করেছে, তার জবাব ইভিএম মেশিনেই দেবেন সকলে। ৪ মে যখন ভোটবাক্স খুলবে, তখন বিজেপি পদ্মফুলের বদলে চোখে সর্ষেফুল দেখবে। মানুষ তৃণমূলের সঙ্গে রয়েছে।’ রানাঘাট লোকসভার সাংসদ জগন্নাথ সরকার বলেন, ‘নদীয়া জেলায় এবার আমরা কোনোভাবেই ১২-র নীচে নামব না। এসআইআরের কোনো প্রভাব পড়বে না। মতুয়াদের নাম বাদ যাওয়ার ফলে তাঁরা আরও এককাট্টা হয়েছেন।’
আজ বুধবার নদীয়া জেলায় দ্বিতীয় দফার ভোট হবে। এসআইআরের কারণে যে সমস্ত এলাকায় বেশি সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে, কমিশনের তরফ থেকে সেগুলিকে সুপার সেনসিটিভ বুথ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাই ভোটারদের নাম বাদের বিষয়টি আসন্ন নির্বাচনে ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। কারণ, নদীয়া জেলায় তিন দফায় ৪ লক্ষ ৮৭ হাজার ৫১৯ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। যার মধ্যে ২ লক্ষ ৮ হাজার ৬২৬ জন বিচারাধীন ভোটার রয়েছেন। যার মধ্যে নদীয়া দক্ষিণের মতুয়া অধ্যুষিত ন’টি বিধানসভাতেই বাদ গিয়েছে ১ লক্ষ ১৬ হাজার বিচারাধীন ভোটারের নাম। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই নটি বিধানসভার মধ্যে আটটিতে জয়ী হয়েছিল বিজেপি। তবে, এবার সেখানে জোর টক্কর দিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেসও।
খসড়া, চূড়ান্ত এবং সাপ্লিমেন্টারি—তিন দফায় নাম বাদ পড়া নিরিখে শীর্ষে রয়েছে রানাঘাট উত্তর পূর্ব বিধানসভা। সেখানে ৪৩ হাজার ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে। এছাড়াও নাকাশিপাড়া বিধানসভায় ৩৮৩৩৭, চাপড়া বিধানসভায় ৩০৮৮৯, শান্তিপুর বিধানসভায় ৩১৮৩৬, রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম বিধানসভায় ৩৬৫২৭, রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভায় ৩৯৭২৯ জন ভোটার কমেছে বিধানসভাগুলিতে। রাজনৈতিক মহলের দাবি, প্রতি বিধানসভায় এই বিপুল সংখ্যক ভোটার হ্রাস রাজনৈতিক দলগুলোর জয় পরাজয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। কারণ এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ার ‘বদলা’র আঁচ পড়বে ইভিএম মেশিনে। শুধু তাই নয়, শুনানির লাইনে দাঁড়িয়েই হয়রানির শিকার হয়েছিলেন কয়েক লক্ষ সাধারণ মানুষ। যদিও শেষপর্যন্ত ফলাফল কি হয় তা ৪ মে জানা যাবে।