• ভোটের লাইনে সল্টলেকের প্রথম বাড়িটির বাসিন্দারা
    বর্তমান | ২৯ এপ্রিল ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ‘উল্টোদিকে তখন (কেষ্টপুর খালের ওপারে) বার্ড কোম্পানির ফাঁকা জায়গা ছিল। সেখান থেকে মাঝেমধ্যেই আসত চোর-ডাকাত। বাড়ির খিল ভেঙে জিনিসপত্র নিয়ে পালাত...’ বললেন সল্টলেকের প্রথম আবাসিক স্নিগ্ধা চক্রবর্তী।  

    সল্টলেক তখন মরুভূমি। ধু ধু বালি। একটি মাত্র আবাসিক বাড়ি তৈরি হয়েছে ‘এ বি’ ব্লকে। আর ‘এ এ’ ব্লকে রয়েছে তিনটি ছোট ছোট সরকারি বাড়ি। ওই বাড়ির বাসিন্দা চক্রবর্তী পরিবার কোথায় ভোট দেবেন? ‘বি ডি’ ব্লকে একটি অস্থায়ী ভোটকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছিল তাঁদের জন্য। এ বি ১২৯ নম্বর বাড়ির বাসিন্দারা বালির উপর দিয়ে হেঁটে সেখানে গিয়ে ভোট দিয়েছিলেন। তাঁরাই সল্টলেকের প্রথম আবাসিক। এবং প্রথম ভোটারও। 

    তাঁরা এবারও যাবেন ভোট দিতে, হয় পিচ রাস্তা দিয়ে হেঁটে বা গাড়িতে বা রিকশয়। এখন আর বালি পেরতে হয় না। বস্তুত বালির চিহ্নই খুঁজে পাওয়া যায় না সল্টলেকে। এখন এ বি ব্লকে হয় ভোটকেন্দ্র। সেখানেই যাবেন সল্টলেকের প্রথম আবাসিক কল্যাণকুমার, স্নিগ্ধা ও সর্বাণী-চক্রবর্তী পরিবারের এই তিন ভাইবোন। যখন সল্টলেকে প্রথম এসেছিলেন তাঁরা তখন ছিলেন যুবক এবং কিশোরী। এখন তিনজনই প্রবীণ নাগরিক।

    স্নিগ্ধাদেবীর তখন বয়স ছিল ১৯ বছর। পড়তেন স্কটিশ চার্চ কলেজে। পরে আইএসআইয়ের শিক্ষিকা হন। জানালেন, তাঁর বোন পড়তেন মিত্র ইনসস্টিটিউশনে। তাঁদের বাস ধরতে হেঁটে যেতে হত গৌরীবাড়ি পর্যন্ত। মার্চ মাসের শুরুতে থাকা শুরু করেছিলেন সল্টলেকে। তখনও বিদ্যুৎ আসেনি। ইলেকট্রিক এল পুজো নাগাদ। তাঁদের বাবা জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী স্ত্রী বীণাপাণিদেবী ও সন্তানদের নিয়ে থাকতে এসেছিলেন ১৯৭০ সালের ৯ মার্চ। 

    একতলা বাড়ি তৈরি করেছিলেন জিতেন্দ্র। তা এখন বেড়ে তিনতলা। বাড়ির নাম ‘মুলঘর’। বাংলাদেশের খুলনার মুলঘর গ্রামে আদি বাড়ি ছিল চক্রবর্তীদের। তারই স্মৃতি নামের মাধ্যমে ধরে রেখে দিয়েছেন স্নিগ্ধাদেবীরা। রাজ্য সরকারের সেচদপ্তরে চাকরি করতেন জিতেন্দ্রনাথ। কল্যানবাবুও বাবার মতো সেচদপ্তরের কর্মী ছিলেন। 

    একদম সঠিক হিসেব ধরলে, আমহার্স্ট স্ট্রিট থেকে ঠিক ৫৬ বছর আগে এসে সল্টলেকে পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন তাঁরা। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে লোকসভা, বিধানসভা, পুরসভা ইত্যাদি মিলিয়ে যতগুলি ভোট হয়েছে, চক্রবর্তীরা সল্টলেকে ততগুলি ভোট দিয়েছেন।

     বর্তমান সল্টলেকের সঙ্গে ১৯৭০ সালের সল্টলেকের আকাশ পাতাল তফাত। ৫৬ বছর আগের সে শহরকে এখন কল্পনাতেও আনা সম্ভব নয়। একমাত্র চক্রবর্তীরাই জানেন, ১৯৭০ সালে কেমন চেহারা ছিল এই অঞ্চলের। আর কিভাবে তা বদলে গেল অভিজাত উপনগরীতে। সল্টলেক বদলেছে—নতুন রাস্তা, নতুন মানুষ, নতুন ছন্দ। কিন্তু এই প্রবীণ মানুষগুলির কাছে শহরটা এখনও অসমাপ্ত চিঠির মতো। যার প্রতিটি পাতা নতুন গল্প লিখছে। সেই গল্পের শেষ লাইনে এই প্রবীণদের এখনও অটুট বিশ্বাস লেখা, একটি ভোট, হয়ত খুব ছোটো তবু নিজের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার প্রধান কাজ। 
  • Link to this news (বর্তমান)