শান্তনু দত্তগুপ্ত: হ্যাঁ, এবার পালটানো দরকার। আপনাদের মানসিকতা। বাংলা মানেই সমাজবিরোধীদের লীলাক্ষেত্র—এই ন্যারেটিভটা পালটাতে হবে। বাংলা মানেই প্রত্যেক মোড়ে একজন ধর্ষিতা হচ্ছেন, পালটাতে হবে এই সস্তার প্রচার-রাজনীতিটাও। যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারি রিপোর্টেই মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধে শীর্ষে রয়েছে ডবল ইঞ্জিন উত্তরপ্রদেশ, সেখানে এই মিথ্যাচার মানায় না। কিন্তু তাও আমরা এই প্রচারেই উদ্বাহু হয়ে নাচানাচি করছি। আমাদের মাতৃভূমির বিরুদ্ধে রাজনীতিকে সার-জল দিচ্ছি। কারণ বিজেপির দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা বলছেন। তাঁদের মিথ্যাচারে গদগদ হয়ে আমরা বলছি, আমাদের বাংলা খারাপ। কারণ, বাংলায় ইডি-সিবিআই হয়। ডবল ইঞ্জিনে হয় না। আমরা সেটাই দেখি। বাংলার বিরুদ্ধে ধিক্কার-মিছিল বের করি। বুঝি না, সেটা পারি এ রাজ্যে গণতন্ত্র আছে বলেই। বাকি রাজ্যে হয় না। শেষ হয়েছিল দিল্লিতে। কংগ্রেস জমানায়। কারণ, গণতন্ত্র ছিল। এখন আর হয় না। তারপরও এক বিশেষ গেরুয়া পতাকার অনুগ্রহধন্য বুদ্ধিজীবীরা চোখ উলটে থাকেন। আর টার্গেট করে যান শুধু বাংলাকে। এই দৈন্য আমাদের মানসিকতার নয় কি? হ্যাঁ, পালটাতে হবে। এই মনোভাব।
হ্যাঁ, পালটাতে হবে ধারণা। বাংলা মানেই বাংলাদেশি নয়। এটা বুঝতে হবে। বিরোধিতা করতেই হবে—এমন একটা মানসিকতায় সাধারণ সেন্সটুকু আমাদের অনেকে হারিয়ে ফেলছি। মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিক বাঙালি হলেই তাকে বেধড়ক মারো। খুন করো। আর না হলে অন্তত জেলে ভরে দাও। আর তারপর রাতের অন্ধকারে পুশব্যাক করে দাও বাংলাদেশে। এটাই তো ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ। আর এই তথাকথিত ‘শিক্ষিত শ্রেণি’ তাতেই সাধু সাধু করছে। পালটান মশাই। এই মানসিকতা পালটান। এই মানুষগুলো আপনারই বাংলার। আপনারই দেশের।
হ্যাঁ, পালটাতে হবে মেকি যুদ্ধের আবহটাও। রাজনৈতিক লড়াইয়ের নামে রাষ্ট্রশক্তি নেমে পড়ছে। চাঁদমারি করা হচ্ছে এক মহিলাকে। সভ্যতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে মিম তৈরি হচ্ছে ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে। আর তারপর তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বাংলায়। তিনি কোভিড পরবর্তী সময়ে মানুষের হাতে সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে টাকার জোগান বাড়িয়েছেন। কিন্তু সেটাকেই আক্রমণ করা হচ্ছে ন্যক্কারজনকভাবে। কারণ, সেটা না করলে তাদের ব্যর্থতাটা ঢাকা পড়ে যাবে। এই ধাপ্পাবাজি কি আমরা ধরতে পারছি না? নাকি দেখেও না দেখার ভান করছি। গোবলয়ের মতো মহিলাদের এই বাংলায় জুতোর তলায় রাখা হয় না। তারপরও আমাদের একটা ‘মহান’ ও ‘সংস্কৃতিবান’ শ্রেণি বাংলার নামে দুয়ো দিয়ে দুটো ভাত বেশি খায়। পালটানো দরকার এই শ্রেণির মানসিকতা। ইভিএমে আঙুল ঠেকিয়ে।
আজ পালটে দিতে হবে সেই ন্যারেটিভটা। সেই লোকগুলোর ধারণা। যারা গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটাই পালটে দিতে চাইছে। একটা মাত্র রাজ্যে ভোট হচ্ছে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে। এনআইএ নেমে গিয়েছে। নৌসেনা বা বিমান বাহিনী নামানোর সুযোগ নেই। তাহলে সেটাও করে ফেলত। শুধু একজন মহিলাকে থামানোর জন্য! একে ভোট বলে? উত্তর ভারতের পারভার্ট মানসিকতা, চাপ এবং নির্লজ্জ ভাবনা থুপে দেওয়াকে নির্বাচন বলা যায় না। এই দেশ আমাদের। সংবিধান আমাদের। গণতন্ত্র আমাদের। কারও চাপিয়ে দেওয়া ন্যারেটিভ আমরা বাঙালিরা মানব না। ভোটের আগে মগজ ধোলাই, আর ভোটের পর ভাতে মারার চক্রান্ত? ইভিএমের অস্ত্রেই আমরা তার বিনাশ করব।
একাকী লড়ে যাওয়া ওই নারীকে কুর্নিশ জানানোর সময় আজ এসেছে। আজ বাঙালির সেই সাহস দেখানোর সময় এসেছে। বাঙালি গোরু-ছাগল নয়, যে তাদের উলটো করে ঝুলিয়ে মারব বললেই তারা গুটিয়ে যাবে। বাঙালি শুধু প্রাক স্বাধীনতা যুগেই বিপ্লবী ছিল না। তখনও সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। আজও দাঁড়াবে। শিরদাঁড়া সোজা রেখে ভোট দেবে। তাহলেই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম মাথা উঁচু করে বাঁচবে।