• গলিতে ক্যামেরা, বাইকে পুলিশ-সেন্ট্রাল ফোর্স, বদলি দুই ADM— আজ ৪ চ্যালেঞ্জ EC-র
    এই সময় | ২৯ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: প্রথম দফায় লেটার মার্কস নিয়ে পাশ করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দ্বিতীয় পর্বের পরীক্ষায় কী হবে? এটাই এখন প্রশ্ন ভোটার থেকে শাসক ও বিরোধী দল- সবার মধ্যেই।

    বাংলায় দ্বিতীয় দফায় সাতটি জেলায় ১৪২টি কেন্দ্রে আজ, বুধবার ভোটগ্রহণ হবে। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনের (সার) আবহে শান্তিপূর্ণ ভোট পরিচালনা করে যত বেশি সংখ্যক ভোটারকে বুথমুখী করাটাই প্রথম দফায় চ্যালেঞ্জ ছিল কমিশনের কাছে। মোটের উপরে সফল ভাবে রক্তপাতহীন ভোট করার জন্য প্রথম দফায় শাসক-বিরোধী নির্বিশেষে সব দলের কাছেই প্রশংসা কুড়িয়েছে কমিশন। প্রশংসা করেছে সুপ্রিম কোর্টও।

    তবে প্রথম দফার তুলনায় এ বারের দফা ইসির কাছে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। তার কারণ হলো- প্রথম, এ বার কলকাতা, দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া সমেত একটা বড় অংশ শহুরে এলাকা। সেখানে এমনিতে ভোটদানের হার তুলনায় কম থাকে। তার উপরে বুথে সামান্য গোলমাল হলে ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে সেখানে তাঁদের আবার বুথমুখী করাটা কঠিন। দ্বিতীয়, শহরাঞ্চলে অলিগলির সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে সেই গলি ব্যবহার করে গোলমাল পাকিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগও দুষ্কৃতীদের কাছে বেশি। তৃতীয়, শহরাঞ্চলেই মূলত রিগিং-ছাপ্পা ভোটের অভিযোগ গ্রামীণ এলাকার তুলনায় বেশি ওঠে। এবং চতুর্থ, এই দফাতেই মুখ্যমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা-সহ ওজনদার প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে গোটা দেশের নজরও থাকবে আজকের ভোটের দিকে।

    এই চ্যালেঞ্জগুলি অতিক্রম করে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করানোটাই এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ নির্বাচন কমিশনের কাছে। বিশেষ করে প্রথম দফার ভোটের আগে রাজ্যের ১৬টি জেলায় সে ভাবে কোনও হিংসা বা রক্তপাতের ঘটনা ঘটেনি। আসেনি বোমাবাজির নালিশও। তবে গত ৪৮ ঘণ্টায় উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দল, পানিহাটি, হালিশহর, হুগলির আরামবাগ, গোঘাট, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার, ফলতা, পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলী, কলকাতা পুলিশ এলাকায় ভাঙড় সমেত বেশ কিছু জায়গায় বিক্ষিপ্ত অশান্তি হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে বোমা উদ্ধার হয়েছে, গুলিচালনারও অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি এই দফায় বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবারে কমিশনের দুই পুলিশ অবজার্ভারকে নিয়ে সুনির্দিষ্ট এর অভিযোগ তুলেছে রাজ্যের শাসকদল।

    ফলে এই সব ক'টি বিষয় মাথায় রেখে এ বার চ্যালেঞ্জটা আরও কঠিন কমিশনের কাছে। এর মধ্যেই সোমবার রাতে অশান্তি পাকানোর অভিযোগে পুলিশ কয়েক জন তৃণমূল কর্মীকে গ্রেপ্তার করলে উত্তেজনা তৈরি হয় হাওড়ার বালিতে। প্রতিবাদে বেলুড় থানার সামনে অবস্থান বিক্ষোভে বসেন বালির তৃণমূল প্রার্থী কৈলাস মিশ্র।

    পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে বচসাও হয় তাঁর। মাঝরাতে আরও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে দেয় কৈলাসকে। হুগলির বলাগড়ের সোমরা বালিগুড়ি এলাকায় বিজেপির মণ্ডল সভাপতির গাড়ি ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের তির তৃণমূল সমর্থকদের দিকে।

    নির্বাচন কমিশন সূত্রের খবর, এ দিন দুপুর পর্যন্ত গত ৬০ ঘণ্টায় ভোটে গোলমাল পাকাতে পারে, এই আশঙ্কায় আড়াই হাজারের বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ দিনই হঠাৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে দুই অতিরিক্ত জেলাশাসককে। তাঁদের মধ্যে একজন ভাস্কর পাল দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার, যেখানে আজ ভোট রয়েছে। অন্যজন বীরভূমের অতিরিক্ত জেলাশাসক সৌভিক ভট্টাচার্য।

    নির্বাচন কমিশন সূত্রের খবর, পূর্ব বর্ধমানের নাদনঘাট, কেতুগ্রাম, দক্ষিণ শহরতলির ভাঙড়, দক্ষিণ ২৪ পরগনার মগরাহাট পূর্ব ও পশ্চিম, ক্যানিং, ফলতা, সোনারপুর- এই কেন্দ্রগুলিতে উত্তেজনার কথা মাথায় রেখে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। এই সাতটি জেলায় ৪,৮৩৩টি বুথকে অতি স্পর্শকাতর বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার প্রায় সবক'টি বুথই রয়েছে। এই বুথগুলিতে ভিতর ও বাইরে তো বটেই, এমনকী সংলগ্ন রাস্তা বা অলিগলিতেও সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি ট্র্যাফিক পুলিশের ক্যামেরার ফিডও নির্বাচন কমিশনের কন্ট্রোলরুমের সঙ্গে লিঙ্ক করে দেওয়া হয়েছে। যাতে ক্যামেরার নজর এড়িয়ে মাছিটিও না গলতে পারে।

    পুলিশ জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ভোটমুখী জেলাগুলিতে ৬৫৩টি জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করা যায়নি। এই অভিযুক্তরা বর্তমানে এলাকাছাড়া বলে কমিশনকে রিপোর্ট করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতের মধ্যেই বাকি ট্রাবল মেকারদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। এ ছাড়া বোমা বিস্ফোরণের আশঙ্কায় সাত জেলাতেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ-র টিম নামানো হচ্ছে। কোনও ভাবে বোমা উদ্ধার ও বিস্ফোরণ হলে তৎক্ষণাৎ তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছবে।

    রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়ালের বক্তব্য, 'আমরা কাউকে গ্রেপ্তার করতে বলিনি। আমাদের কন্ট্রোলরুমে প্রচুর মানুষের অভিযোগ আসছে। ভয় দেখানো, হুমকি, বাধাদানের চেষ্টার মতো বিভিন্ন অভিযোগ আসছে। সেগুলির সত্যতা যাচাই করে পুলিশকে বলা হয়েছে অ্যাকশন নিতে। পাশাপাশি লোকভবন (পূর্বতন রাজভবন) থেকেও প্রচুর অভিযোগ এসেছে। সবই পুলিশের কাছে পাঠানো হচ্ছে।' সিইও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পুলিশকে শক্তিশালী করার জন্য যথেষ্ট ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে।

    পুলিশকে তার ডিউটি করতে হবে। মানুষকে ভয়মুক্ত ভাবে বুথ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। সেটা না-হলে অ্যাকশন নেবে কমিশন। রাজ্যের বিশেষ নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত আবার সাধারণ মানুষের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, যাতে কেউ ছাপ্পা বা ভুয়ো ভোট না-দেন। তাঁর কথায়, 'সবটাই ওয়েবক্যামে রেকর্ডেড হচ্ছে। সেই অনুযায়ী পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ করবে। রেকর্ডিং দেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হবে, যার শাস্তি হলো জেল।'

    এ দিন কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দ ভাঙড় সমেত কলকাতার বেশ কয়েকটি জায়গায় ভোটের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখেন। সিপি বলেন, 'ভোটদানের জন্য কেউ একা বা পরিবারের কাউকে নিয়ে বুথে গেলে তাঁকে ছাড় দেওয়া হবে। কিন্তু ভোটের দিন অযথা বাইক নিয়ে এলাকায় ঘোরাঘুরি করা যাবে না। বাইকে করে কিছু নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কি না, তা তল্লাশি করা হবে।' ইতিমধ্যে কলকাতা জুড়ে এক হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমান মদ ও হিসাব বহির্ভূত টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে খবর পুলিশ সূত্রে।

    জগদ্দলের মেঘনা মোড়ে রবিবার রাতে বোমাবাজি ও ভাটপাড়ার বিজেপি প্রার্থী পবন সিংয়ের নিরাপত্তারক্ষীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার তদন্তে এ দিনই অকুস্থলে যায় এনআইএ-র একটি টিম। যোগেশ শর্মা নামে ওই জওয়ানের পায়ে গুলি লাগে। সোমবারই তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যান সিআইএসএফের শীর্ষ আধিকারিকরা।

  • Link to this news (এই সময়)