• কমিশনের নজরে বিকৃত EVM, হবে রিপোল
    এই সময় | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • এই সময়: প্রথম দফার প্রায় অবিতর্কিত ভাবে লেটার মার্কস পেয়েই উত্তীর্ণ হয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দ্বিতীয় দফায় সার্বিক পারফরম্যান্স কেমন রইল? গত ক’দিনের প্রস্তুতি এবং এ দিনের পরীক্ষার শেষে নিজেদের লেটার মার্কস দিতে না–পারলেও মোটের উপরে যে ভাবে এ দিনের নির্বাচন পর্ব মিটল, তাতে খুশি কমিশনের আধিকারিকরা। প্রথম দফার মতো বুধবার সেকেন্ড ফেজ়ের ভোটেও সার্বিক ভাবে হিংসা হয়নি, গাজোয়ারি করে বুথ দখল, ব্যাপক রিগিং বা ছাপ্পার অভিযোগ তোলেনি কোনও পক্ষই।

    তারপরেও এ দিন সকাল থেকে যে ভাবে বিভিন্ন শিবির থেকে হুমকি বা ভোটে বাধাদানের চেষ্টার অভিযোগ এসেছে কমিশনের কাছে, বিশেষ করে অনেক জায়গায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর অতি সক্রিয়তার অভিযোগ তুলেছে মূলত রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল, তাতে এই দফায় কমিশনের সাফল্যে কিছুটা কালির ছিটে পড়ছেই। কমিশনের অবশ্য দাবি, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিযোগ পাওয়া মাত্র দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন কমিশনের পর্যবেক্ষক, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

    তবে প্রথম দফায় যেখানে রাজ্যের ১৬টি জেলায় ১৫২টি কেন্দ্রে কোনওটিতেই পুনর্নির্বাচন বা রিপোল করাতে হয়নি কমিশনকে, সেখানে ইসির প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ, ফলতা, মগরাহাট পূর্ব–সহ কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রে অন্তত ৭৭টি আসনে ইভিএম বিকৃত করার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে ফলতার ৩২টি বুথে, মগরাহাটের ১৩, ডায়মন্ড হারবারের ২৯, বজবজের ৩টি বুথ রয়েছে। ইভিএমে টেপ আটকে রাখার পাশাপাশি ইভিএমের নির্দিষ্ট বোতামে আতর লাগিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে। একটি কেন্দ্রে স্পাই ক্যামেরা নিয়ে বুথে ঢোকার অভিযোগও উঠেছে।

    কমিশন সূত্রের খবর, এর মধ্যে ২৩টি বুথের রিপোর্ট এ দিন সন্ধের মধ্যেই এসে গিয়েছে। এই বুথগুলিতে রিপোল হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের বক্তব্য, এত নিরাপত্তার কড়াকড়ির মধ্যেও কী ভাবে টেপ বা আতর লাগানোর মতো অভিযোগ উঠছে? তা হলে বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী কী করছি‍ল?

    শান্তিপূর্ণ ও রক্তপাতহীন নির্বাচন করানোর পাশাপাশি কমিশনের কাছে আরও একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল— যে হেতু এ বারের ভোট মূলত শহরাঞ্চলের এবং এই এলাকার ভোটারদের মধ্যে ভোটদানের ক্ষেত্রে একটা অনীহা কাজ করে, তাই ভোটারদের যত বেশি সম্ভব বুথমুখী করা। দিনের শেষে সেই নিরিখে কমিশন পুরোদস্তুর সফল বলা চলে। কারণ, এ দিন সন্ধে ৬টা পর্যন্ত কমিশনের রেকর্ড অনুযায়ী, সাতটি জেলায় ১৪২টি বিধানসভা কেন্দ্রে গড়ে ভোট পড়েছে ৯১.৬৬ শতাংশ।

    জেলার নিরিখে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে পূর্ব বর্ধমানে (৯২.৪৬%), সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে কলকাতা দক্ষিণে (৮৬.১১%)। তবে ২০২১–এর সঙ্গে তুলনায় সবক’টি জেলাতেই পোল পার্সেন্টেজ অনেক বেড়েছে। চমকে দেওয়ার মতো পরিসংখ্যান হলো কলকাতার। ২০২১–এ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গোটা কলকাতায় গড়ে ৬১ শতাংশের মতো ভোট পড়েছিল। এ বার উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার আলাদা ভাবে পোল পার্সেন্টেজ হিসেব করেছে কমিশন।

    তাতে উত্তরে ৮৭.৭৭ এবং দক্ষিণে ৮৬.১১ শতাংশ ভোট পড়েছে। এই বিপুল ভোটদানের পরে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের প্রতিক্রিয়া, ‘পশ্চিমবঙ্গে প্রথম ও দ্বিতীয় দফা মিলিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে ভোটের হার সর্বাধিক। চুনাও কা পর্ব, পশ্চিম বঙ্গাল কা গর্ব।’

    আর রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়ালের কথায়, ‘আজকের ভোট মোটের উপরে শান্তিপূর্ণ ভোট ।কলকাতায় ঐতিহাসিক ভোট হয়েছে। আমি নিজে ভোট দিয়েছি। সেখানকার পোলিং অফিসার বলেছেন, উনি অনেকদিন থেকে ভোট করছেন, তবে এ রকম ভোটের হার এই প্রথম দেখছেন। এটা আমাদের সাফল্য। এটা একটা উৎসব আমাদের কাছে। ভোটারদেরও আমরা তাই বুঝিয়েছি।’

    পরিসংখ্যান বলছে, দেশের স্বাধীনতার পর থেকে বাংলায় গড় ভোটদানের সর্বাধিক রেকর্ড ছিল ২০১১–তে, ৮৪.৭২ শতাংশ। সে বারই ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বছর প্রথম দফার নির্বাচনে বঙ্গে ভোটদানের হারে সর্বকালীন রেকর্ড ছিল ৯৩.১৯ শতাংশ। দ্বিতীয় দফায় তার তুলনায় হার কিছুটা কমলেও বিকেল ৫টার মধ্যে সেই পোল পার্সেন্টেজ ছাড়িয়ে গিয়েছে ২০১১–এর পরিবর্তনের বছরের ভোট শতাংশকে। রাত পর্যন্ত পরিসংখ্যান এলে এই হার আরও অনেকটাই বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। দু’দফা মিলিয়ে রাজ্যে ভোট পড়ল গড়ে ৯২.৪৭ শতাংশ। এ বার পরিবর্তন বনাম প্রত্যাবর্তনের যুদ্ধে এই বিপুল ভোটদানের হারকে অস্ত্র করে নিজেদের জয়ের পক্ষেই যুক্তি সাজাচ্ছে তৃণমূল ও বিজেপি দুই শিবির।

    প্রথম দফার ভোটের পরেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দাবি করেছিলেন, এ বার বাংলায় বিজেপিই ক্ষমতায় আসছে। এমনকী, অনেক জেলায় তৃণমূল খাতাই খুলতে পারবে না। এ দিন ভোট চলাকালীনই উত্তরপ্রদেশের একটি সভা থেকে তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে বিপুল ভোটদানের খবর আসছে। প্রথম দফার মতোই বহু সংখ্যক জনতা ভোটদানের জন্য বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন। লম্বা লম্বা লাইনের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। গত ছ’-সাত দশকে যা হয়নি, যা কল্পনাও করা যেত না— এ বার সেটাই হচ্ছে। ভয়মুক্ত বাতাবরণে পশ্চিমবঙ্গে ভোট হচ্ছে।’

    আত্মবিশ্বাসের সুরে তাঁর সংযোজন, ‘কয়েক মাস আগে বিহারে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ বিপুল জয় পেয়েছে। ক’দিন আগে গুজরাটে পুর ও পঞ্চায়েত নির্বাচনেও বিজেপি ৮০–৮৫ শতাংশ ক্ষেত্রে জয় পেয়েছে। এই পাঁচ রাজ্যেও (বাংলা–সহ পাঁচ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল) ভোটে জিতে ঐতিহাসিক জয়ের হ্যাটট্রিক করব।’ উল্টোদিকে দক্ষিণ কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্রে ভোটদান করার আগেই ভিকট্রি সাইন দেখিয়ে জনতার উদ্দেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ক্ষমতায় আসছে তৃণমূলই। নির্বাচন কমিশনকে বিঁধে তৃণমূলনেত্রী বলেন, ‘ইজ় ইট ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশন? জীবনে এমন দেখিনি। তা সত্ত্বেও বলছি, তৃণমূলই জিতবে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই আমরা জিতব।’

    এ দিন ১৪২টি কেন্দ্রের মধ্যে গোটা দেশের নজর ছিল মূলত ভবানীপুর কেন্দ্রেই। সেখানে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই হচ্ছে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর। হাই–প্রোফাইল এই কেন্দ্রে স্বাভাবিক ভাবেই নজর ছিল কমিশনের পাশাপাশি দেশ–বিদেশের মিডিয়ার। সেখানে কখনও ভুয়ো ভোটার ধরতে ছুটতে দেখা গিয়েছে শুভেন্দুকে। কখনও বাহিনী ও কমিশনের বিরুদ্ধে অতি সক্রিয়তার অভিযোগ তুলেছেন মমতা। তবে বড় কোনও গোলমাল হয়নি। তবে উত্তর দমদমে এক বিজেপি কর্মীর উপরে ব্লেড নিয়ে হামলার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। হুগলির চুঁচুড়ার কারবালায় তৃণমূল, ফরওয়ার্ড ব্লক ও বিজেপির ক্যাম্প ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বাহিনীর বিরুদ্ধে।

    অবশ্য যে সব কেন্দ্রে গোলমালের আশঙ্কা বেশি ছিল— যেমন, ভাঙড়, আমডাঙা, আরামবাগ, গোঘাট, বাসন্তীর মতো এলাকা তুলনামূ‍লক ভাবে ছিল শান্ত। তবে ভাঙড়ে নওশাদ সিদ্দিকিকে ঘিরে বিক্ষোভ দেখানোর অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের। বাসন্তীর ৭৬ নম্বর বুথের সামনে উত্তেজনা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের লক্ষ্য করে জয় বাংলা স্লোগান দেন তৃণমূল কর্মীরা। উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটিতে বিজেপি প্রার্থী রত্না দেবনাথকে ঘিরেও বিক্ষোভ দেখায় জোড়াফুল।

    উত্তেজনা ছড়ায় কলকাতার একবালপুরেও, সেখানে কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে তুমুল বচসা বাধে বিজেপি প্রার্থী রাকেশ সিংয়ের। হাওড়ার দু’টি বুথে দীর্ঘক্ষণ ভোট শুরু না হওয়ায় বিক্ষোভ দেখান ভোটাররা। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাতগাছিয়া বিধানসভায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর লাঠিতে এক শিশু জখম হয়েছে বলে অভিযোগ। এ নিয়ে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের হয়। নদিয়ার নবদ্বীপের বাবলারি এলাকায় ৩৩ নম্বর বুথে বিজেপি কর্মীদের মারধর করার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দু’জনকে আটক করে পুলিশ।

    কিন্তু কিছু বুথে যে ইভিএমে টেপ লাগান‍ো অথবা আতর মাখানোর অভিযোগ উঠছে, সেটা কী ভাবে সম্ভব হলো? কমিশনের এক আধিকারিকের ব্যাখ্যা, মক পোলের সময়েও ইভিএম পরীক্ষা করা হয়েছে। তখন সব ঠিক ছিল। তার পরবর্তী সময়ে কোনও ভোটার ভোট দিতে গিয়ে এই কারসাজি করে থাকতে পারে। তবে বিষয়টি নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এই বুথগুলিতে ওয়েবকাস্টিং খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দেখা হবে প্রিসাইডিং অফিসার, অবজ়ার্ভারদের রিপোর্টও। সব দেখেই রিপোলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

    এই প্রসঙ্গে তিনি টেনে আনেন ২০২১–এর বিধানসভা ভোটে কোচবিহারের শীতলখুচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে মৃত্যুর ঘটনাও। অভিষেক লেখেন, ‘এটি মূলত ২০২১–এর সেই শীতলখুচির মানসিকতা— নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের উপরে ঠান্ডা মাথার নির্মম হিংসা।’ তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘২০২১–এ নির্দোষ মানুষের রক্তের জন্য বিজেপিকে চড়া দাম দিতে হয়েছিল। ২০২৬–এ তাদের আরও বড় মূল্য চোকাতে হবে। আর বাংলার বুকে ঘুরে বেড়ানো সেই জল্লাদদের বলছি, তোমরা কোন রাজ্য থেকে আসছ, তাতে কিছু যায় আসে না। কার রাজনৈতিক আশ্রয়ে তোমরা আছ, তাতেও কিছু যায় আসে না। এই বর্বরতার সঙ্গে জড়িত তোমাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করা হবে এবং আইনের আওতায় আনা হবে। তোমাদের এই সন্ত্রাসের রাজত্বের শেষ হবে চরম ধ্বংসের মধ্য দিয়ে।’

  • Link to this news (এই সময়)