জয় সাহা
তাঁর দাবি, তিনি খবরগুলো পাচ্ছিলেন ভোটের আগের দিন রাত থেকেই। তাই ভোট শুরু না হতেই নজিরবিহীন তৎপরতা শুরু করলেন সকাল থেকে। কখনও বুথে বুথে ঘুরলেন, কখনও ঠায় বসে থাকলেন বুথ ক্যাম্পে, কখনও আবার চরকির মতো পাক খেলেন এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত, কেবলই ভোট কেমন হচ্ছে তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে। তিনি ভবানীপুর কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বহু বিশেষজ্ঞই জানাচ্ছেন, বৃহস্পতিবার ভোটের দিন তাঁর এমন রণং দেহি চেহারা গত তিন দশকে দেখা যায়নি। রীতি মেনে দুপুর-বিকেলের দিকে একবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজের ভোট দেওয়াটাই দস্তুর ছিল মমতার। কিন্তু এ বার সেই ছক নিজেই ভাঙলেন মুখ্যমন্ত্রী।
ভবানীপুরের এখনও ইতিউতি ছড়িয়ে রয়েছে ‘সার’-এর সময়ে হওয়া তৃণমূলের ভোট রক্ষা কেন্দ্রগুলি। কিন্তু এ দিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত গড় রক্ষার মতো করেই প্রথমার্ধে ঘুরলেন পুরো এলাকা। আর কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে কড়া অভিযোগ জানিয়ে আরও যেন চাগিয়ে দিলেন নিজের বাহিনীকে। যদিও বেলা ১২টার আগেই সেই তৎপরতায় পড়ল দাঁড়ি। মমতা যেন তখন অনেকটা নিশ্চিন্ত। গাড়ি ঘুরিয়ে সেই যে ঢুকলেন নিজের বাড়ি, তারপর ফের বেরোলেন বিকেল চারটে নাগাদ—ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশনে নিজের ভোট দেওয়ার জন্য।
মমতার অভিযোগ, ‘বুধবার রাত থেকে আমাদের কর্মীদের হুমকি দিচ্ছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। কাউন্সিলার থেকে নেতা-কর্মীদের বাড়িতে হানা দিচ্ছে। মারধর করেছে। রক্তাক্ত করেছে। এত টেররিজ়ম চলছে। এ ভাবে কি ভোট হয়?’
২০২১–এ শুভেন্দু-গড় নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এবার সেই শুভেন্দু অধিকারীই বিজেপির হয়ে ভবানীপুরে তাঁর বিরুদ্ধে প্রার্থী। সে বার নন্দীগ্রামেও মমতাকে সকাল থেকে এমন ভাবে ভোট করাতে দেখেননি কেউ। দুপুরের পরে নন্দীগ্রামের বয়ালে একটি ভোটকেন্দ্রে যান মমতা। সেখানেই কয়েক ঘণ্টা বসে থাকেন। অভিযোগ ছিল, বিজেপি ওই বুথে ভোট লুঠ করছে। তারপর ফের নন্দীগ্রামে নিজের অস্থায়ী ঠিকানায় ঢুকে পড়েন তৃণমূল সুপ্রিমো। কিন্তু এবার লড়াই তো তাঁর নিজের পাড়ায়, মহল্লায়। তারপরেও মমতা কেন এত তৎপর? প্রশ্নটা ছিল ভবানীপুরের বাসিন্দাদের মধ্যে, এমনকী কর্মীদের মধ্যেও।
সকাল সাড়ে ৭টা বাজার আগেই নিজের কালীঘাটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মেয়র ফিরহাদ হাকিমের পাড়া চেতলায় ছুটে যান মমতা। সেখানে খানিকক্ষণ কাটানোর পরে নিজেই মোবাইল বের করে সাংবাদিকদের দেখান কী ভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনী তাঁর এলাকায় ‘সন্ত্রাস’ চালাচ্ছে। একটা সময়ে রিগিংয়ের অভিযোগ তুলতেও শোনা যায়। পরে অবশ্য সে বিষয়ে তেমন আর মুখ খোলেননি তিনি।
চেতলা থেকে বেরিয়ে কলকাতা পুরসভার ৭০ নম্বর ওয়ার্ডেও যান মমতা। সেখানে দলীয় কাউন্সিলার অসীম বসুর বাড়ি এবং নির্বাচনী কার্যালয়ে সময় কাটান মুখ্যমন্ত্রী। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে গভীর আলোচনা করতে দেখা যায় তাঁকে। অসীমের অভিযোগ ছিল, কেন্দ্রীয় বাহিনী তাঁর বাড়িতে এসে হুমকি দিয়েছে। তখন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। স্ত্রী ও পরিবারের লোকজনকে শাসিয়ে গিয়েছে বাহিনী। মমতাও সেই অভিযোগ করতে থাকেন সমানে।
মমতা যখন অসীমের ফ্ল্যাটে রয়েছেন, নীচে তখন ধুন্ধুমার কাণ্ড। কারণ ঠিক তাঁর ফ্ল্যাটের নীচেই তখন উপস্থিত শুভেন্দু অধিকারী। এলাকা ঘিরে ফেলেছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। কিন্তু শুভেন্দু এলাকা ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মমতা বেরিয়ে আসেন। অসীমকে নিজের গাড়িতে বসিয়ে একাধিক এলাকা চষে ফেলতে শুরু করেন। তারপর বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে ১১টা বাজতে না বাজতেই নিজের বাড়িতে ঢুকে পড়েন তৃণমূল নেত্রী। সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলে যান, ‘তোমরা এবার তোমাদের মতো কাজ করো।’
সকালে চার ঘণ্টার এই ছোটাছুটির পরে অবশ্য এলাকার তৃণমূল কর্মীরা একেবারে চাঙ্গা হয়ে যান। ততক্ষণে শুভেন্দু যে সব জায়গায় যাচ্ছেন, সেই সব জায়গাতে শুরু হয়েছে তাঁকে ঘিরে বিক্ষোভ। শুভেন্দুর কনভয় নানা এলাকায় ঢুকতেই শোনা যাচ্ছে তৃণমূল বাহিনীর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। দিনের শেষে নিজের ডেরা থেকে বেরিয়ে ভোট দিতে যান মমতা। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে ভোট দিয়ে বেরিয়ে দু আঙুল তুলে ‘ভিকট্রি সাইন’ দেখান। তারপর আরও এক দফায় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি দাবি করেন, ‘দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গড়বে তৃণমূল।’ যদিও দিনভর মমতার এই তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। সিপিএম প্রার্থী শ্রীজীব বিশ্বাসের কথায়, ‘অঘটন ঘটার মতো ভোট তো হয়নি। আমি জানি না আপনারা কোন অঘটনের কথা ভাবছেন, তবে আমাদের কাছে মমতা জিতলে সেটাও তো একটা অঘটনই।’