এই সময়: ভোটারদের লম্বা লাইন রয়েছে। কিন্তু বুথের আশপাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের পরিচিত সেই ভিড় নেই। পাড়ায় ঢুকে ভোটারদের ভয় দেখানো বা বাধা দেওয়ার মতো ঘটনাও ছিল না বললেই চলে। বিরোধীদের দিক থেকে ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগও প্রায় নেই, যা আগের ভোটগুলিতে ছিল অজস্র। তবে কিছু বুথে ইভিএম খারাপ হয়ে যায় ভোটপর্বের শুরুতেই, যদিও অল্প সময়ের মধ্যেই বদলে দেওয়া হয় সেগুলি। আউশগ্রামের ভোতা গ্রাম-বিল্লগ্রাম অঞ্চলে ৫২ নম্বর বুথে ইভিএম মেশিন বিকল হয়ে পড়ায় এক ঘণ্টারও বেশি সময় ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকে। প্রায় সব জায়গায় বয়স্কদের হাত ধরে ভোটকেন্দ্রের ভিতরে নিয়ে গিয়েছেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। সব মিলিয়ে বুধবার মোটামুটি শান্তিতেই ভোট মিটল পূর্ব বর্ধমান জেলায়। ভোট পড়ল ৯৩.৫৫ শতাংশ।
এ দিন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মতো বুথের ১০০ মিটারের বাইরে অনেক জায়গাতেই দলগুলোর ফ্ল্যাগ, ফেস্টুন, বেলুন দিয়ে সাজানো ক্যাম্প অফিস চোখে পড়েনি। বর্ধমান শহর, রায়না, খণ্ডঘোষ, জামালপুর বা ভাতারের গ্রামগুলিতেও সেই চেনা ছবি ছিল না। যেখানে চোখে পড়েছে, সেখানেও কোনও ক্যাম্পে ছিলেন না চার জনের বেশি দলীয় কর্মী। কমিশনের নির্দেশ ছিল তেমনই। কোথাও বেশি কর্মী থাকলে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী সরিয়ে দিয়েছে অতিরিক্ত কর্মীকে বা কর্মীদের। এ দিন সকালে বর্ধমানের আঞ্জিরবাগান এলাকায় ভোটকেন্দ্রের ৫০ মিটারের মধ্যে বিজেপিকে ভোট দেওয়ার জন্য প্রচার করতে থাকায় দলের এক কর্মী রতন তিওয়ারিকে আটক করে পুলিশ। খণ্ডঘোষ বিধানসভার ২৩০ নম্বর বুথ এলাকায় তৃণমূলের ক্যাম্পের জন্য সাধারণ মানুষের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দেয় কেন্দ্রীয় বাহিনী।
ভোট ঘিরে সাময়িক উত্তাপও ছড়ায় কোথাও কোথাও। বর্ধমানের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপি প্রার্থীকে দেখেই তৃণমূল কর্মীরা জয় বাংলা স্লোগান দিলে উত্তেজনা তৈরি হয়। সেখানে দু'জনকে আটক করে পুলিশ। মন্তেশ্বরের তৃণমূল প্রার্থী সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর সঙ্গে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের বাদানুবাদে উত্তেজনা ছড়ায় তৈয়বপুরে ১২১ নম্বর বুথে। সেখানে কয়েক জন ভোটারকে লাঠিচার্জ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন সিদ্দিকুল্লা। সামনে পেয়ে কালনার এসডিপিও রোশন দেশমুখকে বলেন, 'ভন্ডামি করছেন।'
খাতা-পেন হাতে নিয়ে তাঁর এবং সেখানে মোতায়েন অন্য পুলিশকর্মী ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের নাম ও পদ জিজ্ঞাসা করতেও দেখা যায় তৃণমূল প্রার্থীকে। মন্তেশ্বরেরই জোকারিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৫ নম্বর বুথে তৃণমূল প্রার্থীর নামের বোতামের উপরে সেলোটেপ লাগিয়ে রাখার অভিযোগ ওঠে। সিদ্দিকুল্লার ইলেকশন এজেন্ট সুদীপ ভট্টাচার্য বলেন, 'একজন ভোটারের কাছ থেকে বিষয়টা জানতে পেরে প্রিসাইডিং অফিসারকে বলার পরে দেখা যায়, তা সত্যি।' এই ঘটনায় সেখানে কিছুক্ষণ ভোট বন্ধ থাকে।
আবার বাদুলিয়া দাসপাড়ায় ভোটকেন্দ্রের ৫০ মিটারের মধ্যে বিজেপির ক্যাম্প অফিসে বসে পদ্মফুলে ভোট চাওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ ওঠে। সেখানে পুজা দাস নামে এক মহিলা বলেন, 'ওরা বলেছে, ক্ষমতায় আসলে দেখে নেবে লিস্ট মিলিয়ে।' অভিযোগ পেয়ে কমিশনের কুইক রেসপন্স টিম সেখানে পরে তিনি বলেন, 'অনেক বছর বাদে ভোট দিয়ে ভালো লাগছে। নিরাপত্তা বেড়েছে। মানুষ শান্তিতে নিজের ভোট পছন্দের প্রার্থীকে দিতে পারছেন।' গুসকরা শহরে আবার এ দিন সকাল থেকেই মাংসের দোকানগুলিতে দেখা গিয়েছে লম্বা লাইন।
স্থানীয় বাসিন্দা সাগর পাল বলেন, 'ভোট আমাদের কাছে উৎসবের মতো। সকালে ভোট দিয়ে মাংস না-কিনলে আনন্দটাই যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়।' আর এক ভোটার অরূপ মণ্ডল জানান, দুপুরে বাড়িতে খাসির মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে টিভিতে খবর দেখার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক দলগুলি ভোটারদের খাইয়েছে, তবে ভোট দেওয়ার পরে। যেমন, ভোট দিয়ে বের হওয়ার সময়ে গলসি বিধানসভার বৃন্দাবনপুরের ২৬৪ নম্বর বুথের বাইরে তৃণমূলের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে মুড়ি ও চপ, বিজেপি দিয়েেেছ আইসক্রিম। বেসুরো চিত্রও রয়েছে। গলসিরই তিলকচন্দ্রপুর গ্রামের বারোবিঘা এলাকায় তৃণমূল কর্মী উত্তম রুইদাসের বিরুদ্ধে ভোটারদের মদ খাওয়ানোর অভিযোগ তোলেন বিজেপি প্রার্থী রাজু পাত্র।
কাটোয়া, কেতুগ্রাম ও মঙ্গলকোটেও এ দিন ছোটখাটো দু-একটি ঘটনা ছাড়া নির্বাচন ঘিরে কোনও বড় অশান্তির অভিযোগ ওঠেনি। তবে বহু বুথেই দেখা মেলেনি বিজেপির এজেন্টদের। মঙ্গলকোটের ৩০৪টি বুথের মধ্যে ১০৫টি বুথে পদ্ম-প্রার্থীর এজেন্ট ছিলেন না। কেতুগ্রাম ও কাটোয়াতেও একাধিক কেন্দ্রে ছিলেন না বিজেপির এজেন্ট। কংগ্রেস ও সিপিএমের এজেন্ট না-থাকা বুথের সংখ্যা বিজেপির চেয়ে বেশি ছিল অনেকটাই। কেতুগ্রামে আইএসএফও এজেন্ট দিতে পারেনি বহু বুথে। কয়েকটি জায়গায় হুমকি দিয়ে এজেন্ট তুলে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে শাসকদলের বিরুদ্ধে।