শ্রীকান্ত পড়্যা, রানাঘাট: ‘এসআইআরে মতুয়াদের টার্গেট করেছে কমিশন। দেদার নাম কেটে দেওয়া হয়েছে। জবাব দিলাম ইভিএমে।’ ভোটগ্রহণ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে রাখঢাক না করেই জানিয়ে দিলেন বিষ্ণুপদ ব্যাপারী।
বিষ্ণুপদবাবুর সৌভাগ্য, তাঁর নামটা বাদ পড়েনি! বুধবার ভোটটা দিয়ে আপাতত গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত করেছেন। কিন্তু, মতুয়া সমাজের একটা বড় অংশ সেটা পারেনি। তাঁদের ভোটাধিকার হারানোর যন্ত্রণা নিজের বলেই অনুভব করেন বিষ্ণুপদবাবু। কারণ, তিনিও মতুয়াদের একজন প্রতিনিধি। এদিন ভোট দিতে এসেছেন রানাঘাট উত্তর-পূর্ব বিধানসভার অধীন বড়বড়িয়া কলোনী প্রাইমারি স্কুলে। সেখানে কমিশন ও বিজেপির বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ উগরে বিষ্ণুপদবাবু বলছিলেন, ‘আমাদের হালদার পাড়ায় একচেটিয়া নাম বাদ পড়েছে। তাঁদের অধিকাংশই মতুয়া। এর প্রতিবাদ না জানালে নিজেকে অপরাধী মনে হবে।’
কিছুটা এগিয়ে গেলেই দত্তপুলিয়া ইউনিয়ন অ্যাকাডেমি। সেখানে পুলিশ ও আধাসেনায় ছয়লাপ। এক অফিসার বলছিলেন, ২০১৯ সালে এই কেন্দ্রে গুলি চলেছিল। এখানে মোট সাতটি বুথে ভোট হচ্ছে। এবার সুপার সেনসেটিভ হিসেবে গোটা চত্বরকে চিহ্নিত করা হয়েছে। দত্তপুলিয়া ১৮২ নম্বর বুথের বিএলও অসীম সাধুখাঁ দাঁড়িয়েছিলেন বুথের বাইরে। ভোটারদের ভোটগ্রহণ কেন্দ্র দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। অসীমবাবু বলেন, ‘আমাদের বুথে মোট ৮৩ জন ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। তারমধ্যে তিনজন মুসলিম। বাকিদের মধ্যে অধিকাংশই মতুয়া। একই বক্তব্য, ১৮৩ নম্বর বুথের বিএলও সন্দীপ মণ্ডলেরও। তিনি বলেন, ‘১৩৭ জন ভোটারের নাম বাদ। তিনজন মুসলিম। বাকিদের মধ্যে মতুয়ার সংখ্যাই বেশি।’
এদিন টেনশন ফ্রি দেখাতে রাস্তায় দাবা খেলতে দেখা যায় রানাঘাট উত্তর-পূর্বের বিজেপি প্রার্থী অসীম বিশ্বাসকে। বোর্ড থেকে চোখ তুলে বললেন, ‘তৃণমূল বধ হচ্ছে।’ ২০২১ সালে তিনি এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। বিধায়ক হিসেবে কেমন কাজ করেছেন অসীমবাবু? জবাবে কামালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পূর্ব নওয়াপাড়া প্রাইমারি স্কুলের ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের সামনে বিজেপি ক্যাম্পে বসা দলীয় কর্মী হেম বিশ্বাস বলেন, ‘বিধায়ক হিসেবে অসীমবাবু জিরো। সেভাবে কাজ করেননি। এবার প্রতীকে ভোট হচ্ছে।’ রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী পার্থসারথী চট্টোপাধ্যায়। গায়ে দলবদলু তকমা এখনও সেঁটে। বুধবার ওই বিধানসভার কেন্দ্রের রামনগর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিলেরমাঠ হরিচরণ বিদ্যাপীঠে ২১২ নম্বর বুথে যেতেই দেখা যায়, তৃণমূলের ক্যাম্পে লোকজন গিজ গিজ করছেন। সেখানেই দেখা যায়, তাপস সরকার, সুজিত দেবনাথ, রাজীব সর্দারদের। তাঁরা প্রত্যেকেই একুশের বিধানসভায় ভোট দিয়েছেন। এবার তালিকা থেকে নাম উধাও। সুজিত, তাপসরা সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করেননি। এসআইআরে নাম বাদ যেতেই সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন। তাই তৃণমূলের ক্যাম্পে এসে এসআইআরের বদলা নেওয়ার কথা বলছেন। সেখানে বসে থাকা তৃণমূল কর্মী বিশ্বজিৎ দেবনাথ বলেন, ‘২০২০ সালে চাটার্ড ফ্লাইটে গিয়ে পার্থসারথীবাবু তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। এবার তাঁকে উপযুক্ত জবাব দেবেন ভোটাররা।’
কৃষ্ণগঞ্জ থেকে রানাঘাট দক্ষিণ, রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম, রানাঘাট উত্তর-পূর্ব ও শান্তিপুর—বড় কোনো গন্ডগোল ছাড়াই ভোট সম্পন্ন হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবেই। ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের বাইরে তৃণমূল ও বিজেপি দুই দলের ক্যাম্পে কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে। তবে, কুপার্স ক্যাম্প থেকে তাহেরপুর, বীরনগর, বাদকুল্লা সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদের ক্ষোভ আঁচ মালুম হয়েছে। সেই ক্ষোভ থেকেই অনেকে তৃণমূলের ক্যাম্পে হাজির হয়েছিলেন। রানাঘাট-২ ব্লকের বিজেপি পরিচালিত কামালপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের নওয়াপাড়া গ্রামের বিপুল বিশ্বাস বলেন, ‘পরিবারের মোট ছ’জন সদস্য। একমাত্র আমি ছাড়া বাকি সকলের নাম বাদ।’