শুভ্র চট্টোপাধ্যায়, কলকাতা: একদিকে গোটা রাষ্ট্রশক্তি, অন্যদিকে প্রতিবাদের মুখ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শহর হাওড়ার দখল নিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী থেকে শুরু করে তাবড় নেতাদের মাঠে নামিয়েছিল বিজেপি। অন্যদিকে, মমতার একমাত্র পুঁজি ছিল আম জনতা। ভোটের দিন বুথের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের ভিড় বুঝিয়ে দিয়েছে, নিঃশব্দে তাঁরা কাজের কাজটি করে দিয়েছেন। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে হাওড়ার জনতা যে এসআইআরের জবাব দিয়েছেন, তাঁদের চোখমুখই তা বলে দিয়েছে। বিজেপিকে আটকাতে তাঁরা তৈরি। যে হাওড়ায় প্রতিটি ভোটে হিংসা দেখতে অভ্যস্ত সকলে, তার লেশমাত্র ছিল না। কোনো গোলমাল ছাড়াই ভোটপর্ব মিটেছে শান্তিতে।
শান্তিতে নির্বাচন সাঙ্গ করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে আরও বেশি বুথমুখী করাই ছিল কমিশনের উদ্দেশ্য। তার প্রমাণ মিলেছে হাওড়া সদর এলাকার সমস্ত বুথে। উত্তর হাওড়া, বালি, মধ্য হাওড়া, শিবপুর বিধানসভার প্রতিটি বুথেই সকাল থেকেই ছিল লম্বা লাইন। ফলে কোথাও ইভিএম খারাপ হলেই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনতা। বালি বিধানসভার সহনলাল স্কুলে সকাল ৬টা থেকেই লম্বা লাইন পড়ে। ইভিএম কাজ না করায় দীর্ঘক্ষণ ভোট শুরু করা যায়নি সেখানে। ফলে ক্ষোভে ফেটে পড়েন সাধারণ মানুষ। ভোট দিতে আসা বিশাল আগরওয়াল অভিযোগ করেন, ইভিএম খারাপ নয়, ভিতরে অন্য খেলা চলছে। তাই তাঁদের ভোট দিতে দেওয়া হচ্ছে না। বিক্ষোভ সামলাতে আসতে হয় পুলিশকে। সেই সময় স্থানীয়দের সঙ্গে ধস্তাধস্তি হয় পুলিশের। চার জনকে আটক করে বেলুড় থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। শেষমেশ সকাল ৮টার পর ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ইভিএম নিয়ে সমস্যা দেখা দেয় সালকিয়া মৃগেন্দ্র দত্ত বিদ্যালয়ে। এখানে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে তাঁদের বচসা হয়। ভোট দিতে আসা পূর্ণিমা দে’র দাবি, এসআইআরের বদলা নিতে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন শুনছি ইভিএম খারাপ। তবে ভোট দিয়েই বাড়ি ফিরব। তবে দ্রুতগতিতে লাইন এগিয়েছে বালির শান্তিরাম স্কুল, বেলুড় হাইস্কুল, উত্তর হাওড়ার সালকিয়া এ এস হাইস্কুল, জনতা হাই, বেলিলিয়াস রোডের একটি বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, মধ্য হাওড়ার রামকৃষ্ণপুর ব্যায়াম সমিতি, কাসুন্দিয়া গার্লস স্কুল সহ বিভিন্ন বিধানসভা এলাকায়। বেলা বাড়লেও বুথমুখী মানুষের সংখ্যা কমেনি। কোথাও ভোটদাতাদের চোখেমুখে বিরক্তি বা ক্লান্তি ধরা পড়েনি।
সব বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটারদের একটাই কথা, এত শান্তিতে ভোট অনেকদিন পর দেখলাম। ভোট দিতে কোনো অসুবিধা হয়নি। ভোট দিতে আসার পথে কারও রক্তচক্ষুর মুখে পড়তে হয়নি। উত্তর হাওড়ার বিক্রম বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আশিস সরকার নামের এক ভোটার বললেন, এই স্কুলের সামনে প্রতি ভোটেই বোমা পড়ে। এবার বোমা তো দূর, টু শব্দটি করতে পারেনি কেউ। শুধু এই স্কুল নয়, অন্যান্যবার মধ্য হাওড়া ও শিবপুরে যে সমস্ত বুথে মারামারি, বোমাবাজি হয়, সেখানেও সেসব উধাও।
এক কথায়, আম জনতা শান্তিতে ভোট দিয়েছে। বাইক বাহিনীর দাপাদাপি ছিল না। তবে এবারের ভোট নিয়ে খুশি তৃণমূল, বিজেপি, সিপিএম থেকে শুরু করে সব দলই। বড়ো ধরনের অভিযোগ কেউ করেনি। ছোটখাট অভিযোগ বাদে ভোট যে ভালোই হয়েছে, বলছে সব দলই।