সুদীপ্ত কুণ্ডু, হাওড়া: এসআইআরের আতঙ্ক বুকে নিয়েই বুধবার ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন ডোমজুড় ও জগৎবল্লভপুরের বাসিন্দারা। শুধু তাই নয়, শারীরিক অক্ষমতা কিংবা বার্ধক্যকে জয় করেও অনেকে শামিল হয়েছিলেন লাইনে। আশঙ্কা, ক্ষোভ আর অদম্য অংশগ্রহণ— এই তিনের মিশেলে বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটে গ্রামীণ হাওড়ার এই দুই বিধানসভায় তৈরি হল এক আবেগঘন চিত্র। অনেকের কথায়, ‘নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার হিসাব-কড়ায় গণ্ডায় দেবে মানুষ।’
ডোমজুড়ের জগদীশপুর পঞ্চায়েতের ৮৭ নম্বর পার্টে মতুয়া ভোটারের সংখ্যা ৭২২। পাশের ৭৫ নম্বর পার্টে তিন শতাধিক। তাঁতিপাড়া, কাছারিবাগান, কুণ্ডুর মাঠ, বাঙালপাড়া— এই বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে প্রায় ১২০০ মতুয়া ভোটার থাকলেও অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রতিটি পার্ট থেকে ৭০-৮০ জন করে নাম বাদ গিয়েছে। কোথাও মায়ের নাম নেই, অথচ ছেলের নাম রয়েছে, কোথাও সাতজনের পরিবারের পাঁচজনের নামই উধাও। ফলে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েও ছিল তীব্র অনিশ্চয়তার ছায়া। স্থানীয় বাসিন্দা অরূপ বর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘তালিকা থেকে আমার মায়ের নাম বাদ। অথচ আমার নাম রয়েছে। এটা কীভাবে সম্ভব? হিন্দুত্বের কথা বলে শেষ পর্যন্ত আমাদের মতো সনাতনীদেরই টার্গেট করা হয়েছে। এর জবাব দিতেই ভোট দিতে এসেছি।’ একই সুর শোনা গেল অশোক ঘোষের গলাতেও।
ডোমজুড় পঞ্চায়েতের ২৪৫ নম্বর বুথে চিত্রটা ছিল আরও বেদনাদায়ক। মুসলিম অধ্যুষিত এই এলাকায় এসআইআরের খসড়া তালিকায় নাম বাদ পড়ার আতঙ্কে মৃত্যু হয়েছে শেখ আজিজুল রহমানের। বাবার মৃত্যুশোক বুকে নিয়েই লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁর ছেলে শেখ ইজাজুল রহমান। তাঁর কথায়, ‘নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার হিসাব মানুষ ৪ তারিখেই দেবে।’ এই বুথে ৮৮৬ জন ভোটারের মধ্যে ১৩৫ জনই এদিন ভোট দিতে পারেননি। তাঁদেরই একজন ইসমাইল শেখের গলায় শোনা গেল গভীর আক্ষেপ। ‘১৯৪৬ সালে এই মাটিতে জন্ম। দেশ স্বাধীন হতে দেখেছি। অথচ আজ ভোট দেওয়ার অধিকারই নেই!’ বলছিলেন ইসমাইল সাহেব।
অন্যদিকে, জগৎবল্লভপুরের পাতিহাল, মাজু, হাঁটাল, শিয়ালডাঙার মতো এলাকায় ছিল ভিন্ন আবহ। মহিলা ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোট দিয়ে বেরিয়ে গৃহবধূদের কণ্ঠে শোনা গেল দৃঢ়তা আর আবেগ— ‘দিদির জন্য আমরা আছি। দিদিকে হারানো এত সহজ নয়। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, সবুজসাথী, কন্যাশ্রী জিতবেই জিতবে।’ আতঙ্ক আর আস্থার টানাপোড়েনে এদিন গ্রামীণ হাওড়ার ভোট যেন হয়ে উঠেছিল মানুষের অধিকার আর আবেগের এক অনন্য প্রকাশ।