নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বাংলার লক্ষ্মীরা এলেন, লাইনে দাঁড়ালেন, ইভিএমে আঙুলের ছাপ ফেললেন, যেখানে যখন দরকার পড়ল গড়ে তুললেন প্রতিরোধ। সবমিলিয়ে বাংলার শেষ দফার ভোটেও ‘লক্ষ্মী ইন, বিজেপি আউট’।
এবারের নির্বাচনে ‘বাংলার লক্ষ্মীরা’ শুধু ভোটার হিসাবেই নয়, বরং একটি সুসংগঠিত সামাজিক শক্তি রূপেও উঠে এলেন। শহরের ভবানীপুর থেকে গ্রামের সাতগাছিয়া, নির্বাচন কমিশনের অনৈতিক প্যাঁচ পয়জার, আধাসেনার চোখরাঙানি থমকে গেল বাংলার লক্ষ্মীদের প্রতিরোধের সামনে।
গত ছ’মাসে ছিল এসআইআর যন্ত্রণা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানো এবং হঠাৎ বে-নাগরিক হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক। আর বুধবার তার সঙ্গে যোগ হল বাহিনীর নির্বিচার লাঠিচার্জ। তাতেও পিছু হটেননি বাংলার নারীরা। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বাহিনীর সামনে রুখে দাঁড়িয়েছেন। আউশগ্রামে ৯, ১০ ও ১১ নম্বর বুথ থেকে বেরিয়ে আঙুলের কালি দেখিয়ে বুক ঠুকে বলেছেন, ‘দিদিকে ভোট দিয়েছি।’ ফলতায় মার খেয়ে বেরিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আবার ফিরেছেন। ভোট দিয়েছেন। বাংলাকে হারতে দেননি। নিজেদের রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার। ভাঙড় থেকে সল্টলেক, শ্যামপুকুর থেকে রাসবিহারী, সোনারপুর, থেকে হাওড়া—সর্বত্র বাংলার লক্ষ্মীরা আঙুলের সুস্পষ্ট ছাপ দিয়ে রাখলেন ইভিএমে।
ছবিটা যে এমন হবে, প্রথম দফাতেই বোঝা হয়ে গিয়েছিল। টোটো, অটো, রিকশ, হেঁটে, ওয়াকারের সাহায্য নিয়ে ভোটকেন্দ্রমুখী নানা বয়সের মহিলা। পায়ের যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছেন। অপেক্ষার কাঁটা পেরিয়ে যাচ্ছে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। তারপরও বলছেন, ‘এই তো একটা দিন। এবার ভোট দেবই।’
প্রথম দফায় রাজ্যের ৯৩ শতাংশেরও বেশি লক্ষ্মী তীব্র রোদ উপেক্ষা করে ভোটের লাইনে দাঁড়ান। দ্বিতীয় বা শেষ দফার ভোটেও এক ছবি। ১৪২ বিধানসভা কেন্দ্রের অধিকাংশ বুথে লক্ষ্মীদের লম্বা লাইন। তা সর্বত্রই পুরুষদের ছাপিয়ে গিয়েছে। মহিলা ভোটের এই ট্রেন্ড চমকে দিয়েছিল বিজেপিকে। অনেকের বক্তব্য, প্রথম দফায় মহিলাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখে বিস্মিত হয়েছিল বিজেপি। তাই দ্বিতীয় দফায় তাঁদের আটকাতে ধীরে ভোটগ্রহণের কৌশল নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। কিন্তু তা কাজে দেয়নি। ‘কমিশনের স্লো ভোটিংয়ের কৌশলে’ দীর্ঘসময় লাইনে দাঁড়িয়ে অধৈর্য হলেন, বিরক্ত হলেন মহিলারা, কিন্তু লাইন ছেড়ে একবারও বেরোলেন না। নিজের ভোটটি দিয়ে, গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করে, আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করে তবে ছাড়লেন ভোটকেন্দ্র।
বাংলার লক্ষ্মীরা প্রথম দফায় বিজেপির জন্য যে কফিন তৈরি শুরু করেছিলেন, দ্বিতীয় দফায় তাতে শেষ পেরেকটি ঠুকে মাটিতে পোঁতার ব্যবস্থা করে দিলেন চিরতরে। মোদি-অমিত শাহ-নির্বাচন কমিশন-আধাসেনা—সবার সব চক্রান্ত ব্যর্থ করেছেন মহিলারা। কারণ, তাঁদের কারও ছেলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকায় পড়াশোনা করে। কারও মেয়ের বিয়ে হয়েছে রূপশ্রীর অনুদানে। কেউ ট্যাব পেয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছেন। কেউ স্বাস্থ্যসাথীর কার্ডে চিকিৎসা করিয়েছেন বাবার। বাংলা এই লক্ষ্মীদেরই মাটি। ভোট এই লক্ষ্মীদেরই অধিকার।