• বিজেপির নির্দেশে বাহিনীর সন্ত্রাস, রাতভর তৃণমূল কর্মীদের বাড়িতে হামলা, ভোটের লাইনে লাঠি, বৃদ্ধের মৃত্যু
    বর্তমান | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি ও সংবাদদাতা: রাজ্যে দ্বিতীয় তথা শেষ দফায় যে ১৪২ বিধানসভা আসনে বুধবার ভোট হয়েছে, সেখানে বিজেপির সংগঠন প্রায় নেই বললেই চলে। বিভাজন, আর বাংলাদেশ জুজু দেখিয়ে তৃণমূলের এই শক্ত গড়ে যে দাঁত ফোটানো অসম্ভব, তা জেনেই গিয়েছিল গেরুয়া শিবির। তাই তাদের শেষ ভরসা ছিল সিআরপি, আইটিবিপি, বিএসএফের মতো আধাসেনা। বিজেপির ‘প্রাইভেট আর্মি’ হয়েই এদিন ভোট করাতে আসরে নেমেছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী। বাংলা দখলের মরিয়া চেষ্টায় মঙ্গলবার রাতে থেকেই কলকাতা সহ জেলায় জেলায় রীতিমতো ‘সন্ত্রাস’ চালাল কেন্দ্রীয় বাহিনী। মধ্যরাতে তৃণমূলের ভোট ম্যানেজারদের বাড়িতে হানা, মহিলাদের সঙ্গে অভব্য আচরণ, দরজায় লাথি তো ছিলই, রাত ফুরোতেই একেবারে তেড়েফুঁড়ে আসরে নামে আধাসেনার জওয়ানরা। বিএনএসের ১৬৩ ধারা (পূর্বতন ১৪৪) অমান্য করে পদ্মপার্টি ক্যাম্প বসালেও সেইসব আধাসেনার ‘নজরেই’ আসেনি। অথচ, ১০০ মিটারের বিধির বাইরে ক্যাম্প করা সত্ত্বেও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তৃণমূলের বুথ অফিস। বেধড়ক লাঠিপেটা করে জখম করা হয়েছে পুরুষ-মহিলা সবাইকে। পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রাম, পূর্বস্থলী, মন্তেশ্বর, গলসি, হুগলির আরামবাগ, হাওড়ার বালি, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা এবং উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটি, ভাটপাড়ার মতো জায়গায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর বর্বরতার শিকার হয়েছেন বহু সাধারণ ভোটার। সেন্ট্রাল ফোর্সের লাঠি রেয়াত করেনি সাতগাছিয়ার আড়াই বছরের দুগ্ধপোষ্য শিশুকেও। সেখানকার ১১৬ নম্বর বুথে লাঠির আঘাতে জখম হয়েছেন ওই শিশুর মা সহ আরও কয়েকজন। শিশুটির নাকে মারাত্মক চোট লেগেছে। হাওড়ার উদয়নারায়ণপুর বিধানসভা এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে এক বৃদ্ধ ভোটারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরে হাসপাতালে ওই বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। এই অভিযোগ অস্বীকার করে কেন্দ্রের জেনারেল অবজার্ভারের দাবি, ভোট দেওয়ার পর অসুস্থ হয়ে ভোটকেন্দ্রেই লুটিয়ে পড়েন ওই বৃদ্ধ। হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

    এই দফার নির্বাচনের ‘ভরকেন্দ্র’ ভবানীপুর এদিন প্রত্যক্ষ করেছে, কীভাবে বিজেপির নির্দেশে পরিচালিত হতে হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীকে। শুধুমাত্র ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠা ‘দলবদলু’ বিজেপি প্রার্থীর মোবাইল ফোনের নির্দেশে ছুটে এসে বেধড়ক লাঠিচার্জ করে আধাসেনার জওয়ানরা। এই পর্বেই বিজেপি প্রার্থীকে গাড়ির পাদানিতে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নির্দেশ দিতে শোনা যায়—‘মারো, পিটো, ভাগাও সব কো!’ এই ঘটনায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ তৃণমূল প্রার্থী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘বিজেপির ইশারায় নাচছেন পুলিশ পর্যবেক্ষকরা। অহেতুক লাঠিচার্জ করা হয়েছে মানুষকে। কিন্তু বিজেপি ও তার দোসরদের জানা উচিত, পুলিশ-কেন্দ্রীয় বাহিনী নয়, ভোটটা দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।’ ভোটযুদ্ধে যাদবপুর ও টালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল দলের কোঅর্ডিনেটর করেছিল বাপ্পাদিত্য দাশগুপ্তকে। এদিন দুপুরে প্রায় তিনঘণ্টা তৃণমূলের এই ভোট ম্যানেজারকে গৃহবন্দি করে রাখে কেন্দ্রীয় বাহিনী। আধাসেনার অতিসক্রিয়তার শিকার হয়েছেন ভবানীপুরের ভোটযুদ্ধে মমতার অন্যতম সৈনিক ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার অসীম বসু (বাবাই)। মঙ্গলবার রাত দুটো নাগাদ তাঁর বাড়িতে হানা দেয় কেন্দ্রীয় বাহিনী। একইভাবে খড়দহেও এক তৃণমূল নেতার বাড়িতে মাঝরাতে হানা দেয় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে মহিলাদের নির্যাতনের অভিযোগ তুলে পর্বস্থলী দক্ষিণ কেন্দ্রের প্রার্থী তথা বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য স্বপন দেবনাথ অবস্থানও করেন। 

    এদিন নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথম দফার মতো শেষ দফাতেও রাজ্যে ভোটিং টার্নআউট অত্যন্ত ভালো। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ১৪২টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ৯২.৪৭ শতাংশ। ভোটের হার আরও বাড়বে বলে কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে। ওই সূত্রটি জানিয়েছে, ভোটপর্বে ইভিএমে প্রার্থীর প্রতীক সেলোটেপ দিয়ে ঢেকে দেওয়ার মোট ৭৭টি বুথ থেকে অভিযোগ এসেছে। তার সবগুলিই দক্ষিণ ২৪ পরগনার। তার মধ্যে ফলতার ৩২, মগরাহাটের ১৩, ডায়মন্ড হারবারের ১৯ এবং বজবজের তিনটি বুথ রয়েছে। রাত পর্যন্ত ২৩টি বুথের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। এই বুথগুলিতে পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনার কথা শুনিয়েছে কমিশন। বাকিগুলি যাচাই করার পর মোট কতগুলি বুথে পুনর্নির্বাচন হবে, তা জানিয়ে দেবে নির্বাচন কমিশন। 
  • Link to this news (বর্তমান)