অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, উত্তরপাড়া
কোন্নগরের কানাইপুরে নেতাজি স্কুলে দু'জনের যখন দেখা হলো, আকাশ তখন মেঘলা। টিপিটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। কিন্তু দুই প্রার্থীর মুখে খেলে গেল হাসির বিদ্যুৎ ঝলক। বুধবার দ্বিতীয় দফার ভোটের সকালে হাইভোল্টেজ কেন্দ্র উত্তরপাড়া দেখল সৌজন্যের ছবি। বামেদের মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় ও তৃণমূলের শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রবল দুই প্রতিপক্ষের হাসি মুখে ছবি মুহূর্তে ভাইরাল। স্কুলের মাঠে মীনাক্ষীকে দেখে শীর্ষণ্য কিছু বলতেও যাচ্ছিলেন। কিন্তু টিভি ক্যামেরা দেখে নিজেই হেসে বললেন, 'এখানে ক্যামেরা অন আছে। রেকর্ড হয়ে যাবে। থাক।' তার আগে মীনাক্ষীও অবশ্য বলে দিয়েছিলেন, 'আমরা দু'জনেই তো মানুষ। দেখা হলে কথা হবেনা কেন?'
লড়াই হওয়ার কথা ছিল ত্রিমুখী। কিন্তু দিনের শেষে যেন সিপিএম বনাম তৃণমূল। পাড়ায় পাড়ায় যখন লাল ঝাণ্ডা আর জোড়াফুলের পতাকার বুথে ভর্তি, বিজেপির সে রকম ভাবে কোনও বুথই খুঁজে পাওয়া গেল না! আরও আশ্চর্যের, মীনাক্ষী ও শীর্ষণ্য যখন গোটা কোন্নগর, উত্তরপাড়া চষে বেড়ালেন, বিজেপি প্রার্থী দীপাঞ্জন চক্রবর্তীকে তখন গোটা দিনে সে ভাবে প্রায় দেখাই গেল না! সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজেপি প্রার্থী নিরুদ্দেশের পোস্টও হলো। ভোট শেষের কিছুক্ষণ আগে অবশ্য একটি বুথে পাওয়া গেল তাঁকে। কে কী বলছে কান না দিয়ে দীপাঞ্জনের মুখে কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রশংসা, 'মানুষ মন খুলে ভোট দিতে পেরেছেন। জেতা–হারার চেয়েও এটা আমার কাছে বড় ব্যাপার।'
মীনাক্ষীকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রবল আগ্রহ ছিল। হাসি মুখে সব সামলাচ্ছিলেন তিনি। বাচ্চাদের জড়িয়ে ধরছিলেন। সেল্ফি তুলছিলেন। এত ঠান্ডা মাথা কী ভাবে? হেসে বাম প্রার্থীর পাল্টা প্রশ্ন, 'কেন আমাকে কি সব সময়ে আগুনে মেজাজে দেখতে ভালো লাগে?' জুড়ে দিলেন, 'মানুষ ভয় জয় করে ময়দানে নেমেছেন। গুন্ডাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। ওঁরাই আমার হয়ে লড়ছেন।'
দুপুরেই দিকে একবারই একটু নিজের মেজাজে এলেন মীনাক্ষী। আনন্দম স্কুলের বাইরে একটি বাড়িতে বহিরাগতরা জমা হয়েছে অভিযোগ তুলে পুলিশকে নিয়ে ঢুকে গেলেন সেই বাড়ির ভিতরে। মুহূর্তে সব ভোঁ–ভাঁ! সেই সময়েই শাস্ত্রীনগরের বুথে ঘুরছিলেন শীর্ষণ্য। সাংবাদিকদের দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, 'এখানে মীনাক্ষী আসেনি?' সঙ্গে নিজেই বললেন, 'অবশ্য এখানে এসে করবে কী? এখানে তো সিপিএম নেই।' ভোট জয়ে শীর্ষণ্যর ব্যাখ্যা, 'দেখুন, আমার জয়ের অঙ্ক খুব সহজ। উত্তরপাড়ায় লড়াই কিছু জায়গায় তৃণমূল বনাম বিজেপি। কিছু জায়গায় তৃণমূল বনাম সিপিএম। অর্থাৎ, সব জায়গাতেই আমরা কিন্তু কমন ফ্যাক্টর। এক নম্বর। গণনার দিনে দেখবেন, দুই রাউন্ডের পরেই হু–হু করে এগিয়ে যাচ্ছি।'
দুপুরের 'লড়াই' উড়িয়ে বিকেলে মীনাক্ষী আবার 'ক্যাপ্টেন কুল।' ভোট শেষে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় যেমন করেছে, তেমনই দিনের শেষে ঝালমুড়ি খেয়ে কার্যত 'উপোস' ভেঙেছেন। মাঝে অনেকেই তাঁকে ভালোবেসে জল–কেক–বিস্কুট দিয়ে যাচ্ছিলেন। সব তিনি বিলিয়ে দিচ্ছিলেন কর্মীদের।
ভোট শেষের সন্ধেয় আবারও কালো মেঘে ঢেকেছিল আকাশ। এল বৃষ্টিও। কিন্তু সেই আকাশেও উজ্জ্বল হয়ে রইল সৌজন্যের ছবি। এ বার অপেক্ষা ৪ মে–র। ফলাফল যাই হোক না কেন, উত্তরপাড়ায় জিতে গেলেন সাধারণ মানুষ। এতেই যেন তৃপ্ত সব প্রার্থী।