এই সময়: বোমা, গুলি, রক্তপাত, হানাহানি, এমনকী মৃত্যুকেও বাংলার ভোটের 'ফিচার' বলে মনে করে গোটা দেশ। কলকাতা লাগোয়া ভাঙড়–ফলতা থেকে শুরু করে উত্তর শহরতলির ভাটপাড়া–জগদ্দল কিংবা হুগলির খানাকুল–গোঘাট অথবা নদিয়ার কল্যাণী–গয়েশপুর। এই সব জায়গায় ভোটের সঙ্গে অশান্তি শব্দটা সমার্থক। ভোট এলেই এ সব সংবেদনশীল জায়গাগুলি ঝামেলার 'হটস্পট' হিসেবে শিরোনাম দখল করে মিডিয়ায়। কিন্তু ছোটখাটো বিক্ষিপ্ত কয়েকটি ঘটনা বাদে বুধবার নিস্তরঙ্গ রইল এই সব স্পর্শকাতর এলাকা।
বস্তুত, ২০২৬–এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার মতোই এ দিন দ্বিতীয় দফার ভোটও মোটের উপরে নির্বিঘ্নেই কাটল। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই স্বস্তিতে নির্বাচন কমিশন। তাই ভাঙড় থেকে বসিরহাট, ক্যানিং থেকে মহেশতলা, ভাটপাড়া থেকে আমডাঙা কিংবা খানাকুল থেকে আরামবাগ—অতীতে বোমাবাজি, বুথ দখল, ভোটারদের ভয় দেখানোর মতো একের পর এক অভিযোগে চিহ্নিত হটস্পটগুলিতে বুধবার মোটামুটি শান্তির বাতাবরণই ছিল দিনভর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের বক্তব্য, এ বারে বাংলার ভোটে যে আড়াই হাজার কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল, এর নেপথ্যে সেটিও অন্যতম কারণ।
যদিও ভোট মানেই ক্যানিং পূর্ব কিংবা ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্রে উত্তেজনা মাথাচাড়া দেবে— এ ছবি নতুন নয়। ২০২১–এর বিধানসভা ভোটেও এখানে দফায় দফায় বোমাবাজি ও সংঘর্ষের অভিযোগ উঠেছিল। চলেছিল গুলিও। স্থানীয়দের একাংশের দাবি ছিল, বুথের বাইরে দুষ্কৃতীদের জমায়েত দেখে বহু ভোটার বুথমুখো হননি। অনেকে আবার ভোটের আগে থেকেই ঘরছাড়া হয়েছিলেন। বসিরহাট মহকুমার একাধিক জায়গায় ২০১৮–এর পঞ্চায়েত ভোটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে না-পারার অভিযোগ শিরোনামে এসেছিল।ক্যানিং-আমতলা তল্লাটেও অতীতের অভিজ্ঞতা কম তেতো নয়।
গত ২০২৪–এর লোকসভা ভোটে ক্যানিংয়ের বেশ কিছু বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকা সত্ত্বেও ভোটারদের লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে চাপানউতোর, এমনকী মারধরের অভিযোগ উঠেছিল। মহেশতলায় ২০২১-এর ভোটে বুথ দখল ও এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে দিনভর উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। ডায়মন্ড হারবারেও ভোটের দিন সংঘর্ষ ও পথ অবরোধের নজির রয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার আমডাঙা, ভাটপাড়া, জগদ্দল, টিটাগড় থেকে শুরু করে নদিয়ার গয়েশপুর, কল্যাণী, চাকদহে বোমাবাজি কিংবা হুগলির আরামবাগ, গোঘাট, খানাকুলে ভোটের আগে ভোটারদের বাড়ি 'সাদা থান' পাঠানোর হুমকি ইত্যাদিও পরিচিত নজির।
কিন্তু এ বার সে সব কিছুই দেখা যায়নি। অতীতের অশান্তির ধারাবাহিকতার সঙ্গে এ বারের ছবির ফারাক চোখে পড়ার মতো। দ্বিতীয় দফার ভোটে সকাল থেকেই স্পর্শকাতর বুথগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহল, রুটমার্চ ও কড়া নজরদারির জেরে বড়সড় অশান্তির কোনও খবর মেলেনি।
অধিকাংশ বুথেই ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট দিয়েছেন। ফলে বিকেল ৫টাতেই প্রায় ৯০ শতাংশ ভোট পড়ে গিয়েছে অধিকাংশ জায়গাতে। কোথাও বিচ্ছিন্ন বচসা বা ছোটখাটো উত্তেজনা থাকলেও তা বড় আকার নেয়নি। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, প্রথম দফার মতো দ্বিতীয় দফাতেও বিরোধী শিবিরের তরফেও বিক্ষিপ্ত কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া কোনও বড়সড় অভিযোগ তোলা হয়নি। ছাপ্পা, বুথ জ্যাম, রিগিংয়ের অভিযোগও নেই বললেই চলে। ছোটখাটো ব্যতিক্রম বলতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা এবং উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটির কয়েকটি বুথে ইভিএম সংক্রান্ত অভিযোগ।
ফলে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরে খুশি আমজনতাও। ভোটারদের একাংশ বলছেন, 'আগের মতো ভয় বা দৌরাত্ম্য চোখে পড়েনি কোনও রাজনৈতিক দলের তরফেই। নির্ভয়ে ভোটটা দিতে পেরেছি।' প্রশাসনের দাবি, আগেভাগে স্পর্শকাতর ও 'ক্রিটিক্যাল' বুথ চিহ্নিত করে সেখানে অতিরিক্ত বাহিনী, মাইক্রো-অবজার্ভার ও সর্বত্র ওয়েবকাস্টিংয়ের ব্যবস্থা করাতেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, 'বাংলার ভোট রক্তক্ষয়ী হচ্ছে, অতীতে এমনটা বেশি দেখা গিয়েছে পুরভোট ও পঞ্চায়েত ভোটে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর না–থাকা ওই সব ভোটে একটা বড় 'ফ্যাক্টর' ছিল। ফলে সেই বদনামের ছবিতে পর্যাপ্ত প্রলেপ দিতে পারেনি গত কয়েকটি তুলনায় নির্বিঘ্নে হওয়া বিধানসভা কিংবা লোকসভা ভোট। সারা দেশের মননে বাংলার ভোটের অশান্তির ছবিটাই স্থায়ী হয়ে গিয়েছে।'
সেই ভয়ের ছবি এ বারের শান্তিপূর্ণ ভোট মুছে দিতে পারে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর যদিও ভবিষ্যতেরই গর্ভে।