সুগত বন্দ্যোপাধ্যায়
মঙ্গলবার তখন রাত তিনটে। দ্বিতীয় দফার ভোটের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নিয়ে ১৪২টি বিধানসভা কেন্দ্রের বিভিন্ন থানার ওসি–আইসিদের সঙ্গে ভার্চুয়াল মিটিং করছিলেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়াল, বিশেষ নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত এবং বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক এনকে মিশ্র। হঠাৎ সিইও দপ্তরে অভিযোগ আসে, লেকটাউনের একটি হলে ভোটের জন্য ভিন জায়গা থেকে প্রচুর লোককে এনে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়াও কাশীপুর–বেলগাছিয়ার বিভিন্ন জায়গায় মানুষকে ভয় দেখানো হচ্ছে। দুই পর্যবেক্ষক ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নিয়ে রাতেই ঘটনাস্থলে যান সিইও। তাঁরা গিয়ে দেখেন, সেখানে তখন বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে। কমিশনের কর্তাদের দেখে বিয়েবাড়ির আয়োজকরা তাঁদেরও পাত পেড়ে খাওয়ার অনুরোধ করেন। তবে শুধু জল খেয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়েন তাঁরা।
শুধু লেকটাউন নয়, মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটে পর্যন্ত উত্তর কলকাতার বিভিন্ন পাড়ায় ঘুরে বেড়ান সিইও ও তাঁর সঙ্গীরা। সরেজমিনে দেখার চেষ্টা করেন, পুলিশ–কেন্দ্রীয় বাহিনী কাজ করছে কি না। ভোর সাড়ে ৪টে নাগাদ আবার দপ্তরে পৌঁছে যান সিইও এবং দুই অবজ়ার্ভার। রাতভর তাঁরা কখনও মোবাইলে চোখ রেখেছেন, কখনও কন্ট্রোলরুমের স্ক্রিনে খোঁজ নিয়েছেন কোথাও অশান্তি হচ্ছে কি না। এর মধ্যে রাত গড়িয়ে ভোর হয়েছে।
সকাল থেকে ফের কন্ট্রোলরুম থেকে বা রাস্তায় নেমে ভোট দেখেছেন তাঁরা। বিক্ষিপ্ত অশান্তি, কোথাও ইভিএমে বিকৃতির চেষ্টা — এ সবের মধ্যেও যে ভাবে রক্তপাতহীন ভোট পরিচালনা করা গিয়েছে, দিনের শেষে তাতে হাসি সবার মুখে।২০২১–এ বাংলায় ২৪ জন এবং ২০১৬–তে ৭ জন মারা মারা গিয়েছিলেন ভোট-হিংসায়। গত বিধানসভা ভোটে অন্তত ৬০টি বোমাবাজির ঘটনাও ঘটে। এ বার ভোট চলাকালীন কোনও বোমাবাজি, হিংসা বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি কমিশনের। এর জন্য সিইও দপ্তরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারও।
তবে সিইও বলেন, 'বসের (সিইসি) সঙ্গে কথা হয়ছে। বস আমাকে কত নম্বর দেবেন, সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু আমরা আমাদের দায়িত্বটা ঠিকঠাক পালন করতে পেরেছি কি না, সেটা ওঁকে জানিয়েছি।'কমিশনের দাবি, এ বারের ভোটে পুলিশ–প্রশাসনকে কড়া হাতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে বাধ্য করা হয়েছে। যার জেরে বুধবার সকালে ভবানীপুর থানার পুলিশ সকালে মুখ্যমন্ত্রীর পাড়ায় তৃণমূলের ক্যাম্প অফিসের সামনে চায়ের আসর থেকে তাঁর ভাই কার্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পর্যন্ত সরিয়ে দিয়েছে। ভোটের দিন পুলিশের এই ভূমিকা অতীতে দেখা যায়নি বলেই কমিশনের দাবি।
দ্বিতীয় দফার ভোট কেন এত সংবেদনশীল? সিইও-র ব্যাখ্যা, ভৌগোলিক ভাবে ছোট এলাকা হলেও এখানে জনসংখ্যা অনেক বেশি, প্রচুর ঘিঞ্জি এলাকা আছে। তা ছাড়া এই কেন্দ্রগুলিতে হেভিওয়েট প্রার্থীদের ভিড় বেশি। কিন্তু সব মিলিয়েও শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট করিয়ে ভোটদানের হার বাড়ানো একটা বড় লক্ষ্য ছিল কমিশনের। তার জন্য এতদিন প্রচার চলেছে।
কলকাতা ও শহরতলির বহুতলেও নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে। বোমা–গুলি বন্ধে প্রতিটি থানার ওসি ও সুপারভাইজ়িং অফিসারদের কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে বোমা উদ্ধারে নামানো হয় এনআইএ–কেও। ফলে বড় অশান্তি হয়নি। শেষ পর্যন্ত পাওয়া খবর, হাওড়ার গ্রামাঞ্চলে একটি বোমা পড়ার অভিযোগ উঠলেও পুলিশ তৎক্ষণাৎ তৎপর হয়।কমিশনের দাবি, এই দফাতেও কোনও বুথ থেকে এজেন্টদের জোর করে তুলে দেওয়ার অভিযোগ করেনি কোনও রাজনৈতিক দল।
কমিশনের কন্ট্রোলরুমে মোট ৩,৫৬৬টি অভিযোগ এলেও প্রতিটি খুঁটিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যে বুথগুলিতে ইভিএমে টেপ বা আতর লাগানোর অভিযোগ উঠেছে, সেগুলি আলাদা করে খতিয়ে দেখা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট মিললে কতগুলি বুথে রিপোল হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। ওয়েবক্যামের রেকর্ড দেখে কারা এই সব কাজ করেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রিসাইডিং অফিসারদের ভূমিকাও দেখা হবে।
বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত বলেন, 'এতকিছুর পরেও কিছু জায়গায় ভুয়ো ভোট পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ইভিএমে বিকৃতির পাশাপাশি কয়েকটি জায়গায় স্পাই ক্যামেরা লাগানো পেন নিয়ে কিছু ভোটার ঢুকেছেন বলে খবর আসে। সেটা ধরাও পড়েছে। হাওড়া, বিধাননগর, দমদম, রাজারহাট-গোপালপুর থেকে বিক্ষিপ্ত ভাবে যতটুকু ভুয়ো ভোটের অভিযোগ এসেছে, সেগুলিও ওয়েবকাস্টিংয়ের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।'