স্নেহাশিস নিয়োগী
বিধানসভা নির্বাচনের পর্ব এ বারের মতো সাঙ্গ। এতদিন বুথে বুথে ফার্স্ট পোলিং অফিসার ভোটারের নাম ডেকে তালিকায় দাগ দিতেন। সেই নাম ও ক্রমিক নম্বর মিলিয়ে লিস্টে টিক দিতেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এজেন্টরা। আর থার্ড পোলিং অফিসার ভোটারের আঙুলে কালি লাগানোর পরে বুথেই সেই ভোটার স্লিপ ছিঁড়ে ফেলাটাই ছিল দস্তুর। কিন্তু প্রথম দফার ১৫২টি আসনের পরে বুধবার ১৪২টি বিধানসভার কয়েক হাজার বুথে একেবারেই তার উল্টো চিত্র দেখল বাংলা।
বর্ধমান উত্তর থেকে বসিরহাট, করিমপুর থেকে কাকদ্বীপ সর্বত্র ভোটাররা ইভিএমে পছন্দের প্রতীকে বোতাম টেপার আগে নিরীহ এই ভোটার স্লিপ তড়িঘড়ি পকেটে পুরে নিয়েছেন। এর পিছনে অন্যতম কারণ–––ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন। বেশ কিছুদিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভোটার স্লিপ সংক্রান্ত একটি নির্দেশিকা ভাইরাল হয়। সেখানে লেখা ছিল––এই ভোটার স্লিপ রক্ষা করুন। প্রয়োজনে জেরক্স করেও রাখুন। ভবিষ্যতে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে এই স্লিপের গুরুত্ব অপরিসীম। পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি বা অন্যান্য নাগরিকত্ব সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রে এই স্লিপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যদিও কমিশনের তরফ থেকে জানানো হয়–এরকম কোনও নির্দেশিকা তারা জারি করেননি।
প্রথম পর্বে উত্তরবঙ্গের মতো দ্বিতীয় দফার ভোটে কলকাতার উপকণ্ঠে রাজারহাট–গোপালপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অরবিন্দ বয়েজ় হাইস্কুলে এ দিন সকালে ভোটার স্লিপের গুরুত্ব ছিল দেখার মতো। কিছু ভোটারের স্লিপ ভোটকর্মীরা রেখে দিয়েছিলেন। আবার কিছু ভোটারকে স্লিপ দিয়ে দিয়েছিলেন। তা নিয়ে শুরু হয় সমস্যা। যে সব ভোটারের স্লিপ কর্মীরা নিয়ে রেখে দিয়েছিলেন, তাঁরা সরাসরি জওয়ানদের কাছে এ ব্যাপারে অভিযোগ করেন। সকলে মিলে ফের বুথে ঢুকে পড়েন জমা রাখা স্লিপ প্রিসাইডিং অফিসারের থেকে ফেরত নেওয়ার জন্য। ফলে বেশ কিছুক্ষণ ভোটদান পর্ব গতি হারায়। আবার ভবানীপুরের জয়হিন্দ বুথের ভোটার সোনা ঘোড়ুই বুথের স্লিপ জেরক্সও করে রেখে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, 'ভবিষ্যতে আবার যদি 'সার' হয় অথবা এনআরসি, তখন এই ভোটার স্লিপ কাজে লাগতে পারে।' তেহট্ট, বসিরহাট, হিঙ্গলগঞ্জ, কাকদ্বীপ, বাগদা, গলসি, বনগাঁ এবং করিমপুর সহ অনেক বিধানসভার একাধিক বুথে এ দিন একই চিত্র দেখা গিয়েছে।
যদিও নির্বাচন কমিশনের এক আধিকারিক জানাচ্ছেন, এই ধরনের ভাবনা অযৌক্তিক। এমন কোনও নিয়মই নেই। শুধুমাত্র ভোটার পরিচয়পত্র হিসেবে ওই স্লিপ নিয়ে ভোট কেন্দ্রে আসার কথা। সেই স্লিপ দেখে সঠিক ভোটার চিহ্নিত করে তারপর ভোট দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। এর বেশি ওই স্লিপের কোনও ভূমিকা নেই। অনেক ভোটারের মতে, ভোটের সময়ে অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তরফে ভোটার স্লিপ বাড়িতে দিয়ে যেত। কিন্তু এ ভাবে নির্বাচন কমিশনের তরফে কোনও দিনই বাড়ি এসে ভোটার স্লিপ দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের সই করে নেওয়া এবং ভোটকেন্দ্রে ঢোকার আগে বুথ লেভেল অফিসারের (বিএলও) যাচাই করার চলই ছিল না। তাই স্বাভাবিক ভাবে ভোটার স্লিপ নিয়ে কী করণীয়, সেই বিষয়ে ভোটারদের মধ্যে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়।
সিঙ্গুরের বাসিন্দা শিশির দাস মণ্ডলের কথায়, '২০১৬–র নোটবন্দি থেকে শুরু করে নানা অছিলায় বারবার সাধারণ মানুষকে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে। তাই বিএলও যখন বুথ স্লিপ দিয়েছে, সেটা ছিঁড়ে ফেলার কী দরকার। তাই ভোট হয়ে গেলেও যত্ন করেই স্লিপটা রেখেই দিয়েছি।' তাঁর সংযোজন, ২০–২২ বছর পরে আবার কোনও দিন 'সার' হলে, সে সময়ে এটা নথি হিসেবে দেখাতে পারব। তাই রেখে দিলাম।
যদিও সিইও–র দপ্তর জানাচ্ছে, ভোটারদের এমন আতঙ্ক যুক্তিহীন। ভোট মিটে যাওয়ার পরে স্লিপের আর কোনও মূল্য নেই।