সংবাদদাতা, হলদিয়া: হলদিয়া বন্দরের মাধ্যমে ফের পণ্য আমদানি রপ্তানি বাড়াতে শুরু করেছে নেপাল। শুধু বাণিজ্য নয়, ভারত নেপাল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বলে মনে করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। হলদিয়া বন্দরের মাধ্যমে নেপালে যে পণ্য আমদানি রপ্তানি হয়, তা "নেপাল কার্গো" হিসেবে চিহ্নিত হয়। বিভিন্ন কারণে গত কয়েক বছর ধরে হলদিয়ায় সেই নেপাল কার্গোর পরিমাণ কমছিল। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে নেপাল কার্গো অনেকটা বেড়েছে বলে বন্দর সূত্রে জানা গিয়েছে। স্টিল, নন-কুকিং কোল, ভোজ্য তেল আমদানি বাড়িয়েছে নেপাল।
নেপাল কার্গো ছাড়াও গত আর্থিক বছরে হলদিয়া বন্দরে কুকিং কোল, ভোজ্য তেল, ম্যাঙ্গানিজ, কোক, স্টিল জাতীয় পণ্য পরিবহণ বেড়েছে। পাশাপাশি বন্দরের মাধ্যমে কন্টেনারবাহী পণ্য পরিবহণ ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে বলে দাবি বন্দরের। উল্টোদিকে, নন-কোকিং কোল এবং লাইমস্টোন গত আর্থিক বছরের তুলনায় ১৭ শতাংশ কমে গিয়েছে। তবে সবমিলিয়ে ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে হলদিয়ায় পণ্য পরিবহণ আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু বন্দরে এই পণ্য পরিবহণ কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে, তা নিয়ে দুধরনের পরিসংখ্যানে ধন্দ তৈরি হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ইদানিং ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রিপোর্ট তৈরি করছে বলে অভিযোগ ইউনিয়নগুলির।
বন্দরের একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫-২৬ সালে হলদিয়া ডক কমপ্লেক্সে মোট ৪৫.১১ মিলিয়ন মেট্রিক টন পণ্য পরিবহণ হয়েছে। তার আগের বছর ২০২৪-২৫ সালে পণ্য পরিবহণ হয়েছিল ৪৪.৮৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অন্যদিকে, ইন্ডিয়ান পোর্ট অ্যাসোসিয়েশনকে বন্দর যে তথ্য দিয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫-২৬ সালে হলদিয়ায় ৫১.৮৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন পণ্য ওঠানামা করেছে। সেখানে তার আগের বছর ওঠানামা করেছে ৪৭.৩১ মিলিয়ন মেট্রিক টন। অর্থাৎ ২০২৫-২৬ সালে বন্দর প্রায় ৭ মিলিয়ন টন কার্গো পরিবহণ বাড়তি দেখিয়েছে। হলদিয়া বন্দরে পণ্য পরিবহণ বৃদ্ধিতে দুধরনের তথ্য নিয়ে বন্দর বিশেষজ্ঞ মহলে প্রশ্ন উঠেছে ইতিমধ্যেই। গতবছর থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের নয়া প্রবণতা নিয়ে বিতর্ক দানা বাঁধে। শ্রমিক ইউনিয়নগুলির অভিযোগ, বন্দর কর্তৃপক্ষ হলদিয়ার পণ্য পরিবহণের খতিয়ান বাড়তি দেখিয়ে কেন্দ্রের জাহাজমন্ত্রকের কাছে বাহবা পেতে চাইছে। বন্দরের পরিসংখ্যানে "জল মেশানো" রয়েছে বলে শ্রমিক ইউনিয়নের অভিযোগ। জল মেশানো পরিসংখ্যান দেখাতে গিয়ে উল্টে কেন্দ্রের বঞ্চনার মুখে পড়ছে, নাব্যতা সমস্যা মেটাতে ড্রেজিংয়ের ন্যায্য টাকা মিলছে না বলে বাম ডান উভয় ইউনিয়নের অভিযোগ।
গতবারের তুলনায় চলতি আর্থিক বছরে হলদিয়া বন্দর প্রায় সাড়ে ৪ মিলিয়ন টন কার্গো পরিবহণ বেশি হয়েছে বলে দাবি বন্দর কর্তৃপক্ষের। এতদিন বন্দরের ডক এলাকায় জাহাজে পণ্য ওঠানামার হিসেব হত। গত বছর থেকে বন্দর এলাকায় রেলের রেকে করে যে পণ্য আসছে, তা জাহাজে ওঠানামা না করলেও, তাকে বন্দরের কার্গো হিসেবেই ধরা হচ্ছে। বন্দরের যুক্তি, যেহেতু বন্দর এলাকার রেল বা সড়ক পরিকাঠামো ব্যবহৃত হচ্ছে, সেজন্য ওই পণ্য বন্দরের কার্গো বলে ধরা হচ্ছে। বন্দরের জেনারেল ম্যানেজার(প্রশাসন) প্রবীণকুমার দাস বলেন, গত বছরের তুলনায় এবছর বন্দরে পণ্য ওঠানামা অনেকটা বেড়েছে। বন্দরের ম্যানেজমেন্টের নতুন পরিকল্পনা রূপায়ণ ও বিশেষ ছাড়ের উদ্যোগের জন্য কয়লা, স্টিল, ভোজ্য তেল বাড়ছে। নেপাল কার্গো ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। এখন প্রায় ১০ লক্ষ টন ভোজ্য তেল নেপাল হলদিয়ার মাধ্যমে আমদানি করছে। কন্টেনার কার্গো ১৩ শতাংশ বেড়েছে। কোকিং কোল ১২ শতাংশ বেড়েছে। জাহাজমন্ত্রকের অনুমোদন নিয়েই বন্দর এলাকায় রেলের কার্গো বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। তবে নতুন নিয়ম নিয়ে বন্দর বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা বলেন, দুবছর আগে হলদিয়া কোনো ধরনের জল মেশানো রিপোর্ট ছাড়াই ৫০ মিলিয়ন টন পণ্য পরিবহণ করে রেকর্ড করেছিল। এখন তার ধারে কাছেও পৌঁছতে পারছে না বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাঁদের বক্তব্য, একসময় মাঝসমুদ্রে ট্রান্স লোডশেডিং অপারেশনের মাধ্যমে বড় জাহাজ থেকে তেল ও গ্যাস হলদিয়া আনত। সেই সংখ্যা দিন দিন কমছে।