• মাওবাদী আন্দোলনের পৃথক ফসল! লাল-সন্ত্রাস দমনে অপারেশনের মাঝে লোকমুখে স্কুলের কাহিনি
    প্রতিদিন | ৩০ এপ্রিল ২০২৬
  • ‘মাওবাদী রক্তচক্ষু’র ভীতি কেটে গিয়েছে, লাল সন্ত্রাস অতীত। সরকারিভাবে একথা ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। তার মধ্যেই তেলেঙ্গানার (Telangana) সিদ্দিপেট জেলার লোকজন স্মরণ করছেন মাওবাদী আন্দোলনের একটি পৃথক ফসলের কথা। সেই ফসল আর কিছুই নয়, কমিউনিটি বা গ্রামবাসীদের শ্রমে তৈরি হওয়া একটি স্কুল, যা আজও টিকে রয়েছে। এখনও বাচ্চাদের পড়াশোনা অব্যাহত রয়েছে সেই প্রতিষ্ঠানে।

    নয়ের দশকে তৈরি হয়েছিল সেই স্কুল। সেই সময়টা মাওবাদী, নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। কিন্তু তার মধ্যেই প্রবল ঝুঁকি নিয়ে গ্রামবাসীদের সংগঠিত করে স্কুল নির্মাণে হাত দেয় মাওবাদী নেতৃত্ব। মাওবাদীদের সঙ্গে পুলিশ, সরকারি বাহিনীর এনকাউন্টারে রক্তাক্ত হত গ্রামের রুক্ষ মাটি। তাদের গ্রামে আশ্রয় দেওয়া কার্যত অকল্পনীয় ব্যাপার ছিল। সরকারে রোষের মুখে পড়ার ভয় ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও অক্ষর জ্ঞানের প্রতি প্রবল আকর্ষণ, তাগিদ থেকে মাওবাদীদের প্রয়াসে শামিল হন গ্রামের লোকজন। ডুব্বাক এলাকার একাধিক গ্রামের লোকজন জানাচ্ছেন, মাওবাদীরা শুধুই হিংসার রাজনীতি করেনি, বেশ কিছু সামাজিক গঠনমূলক কর্মসূচিও হাতে নিয়েছিল। যে সময়টায় মাওবাদীরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল, রাতের আলো আঁধারি ছায়ায় ঢাকা পথে গ্রামে ঢুকত সশস্ত্র মাওবাদীরা। তাদের প্রাথমিক টার্গেট যদিও অত্যাচারী ভূস্বামী-জমিদাররা, একইসঙ্গে তারা গ্রামবাসীদের সঙ্গে বৈঠক করত কমিউনিটি অর্থাৎ সম্প্রদায়কেন্দ্রিক নানা প্রকল্প নিয়েও।

    দুমপালাপল্লি গ্রামে এককালে গাছের তলায় পড়াশোনা করতে বাধ্য হত, কারণ মজবুত স্কুলবাড়ি বলে কিছু ছিল না। ১৯৯১ নাগাদ লাগাতার বর্ষায় গাছতলায় পড়াশোনা করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। নাচার হয়ে গ্রামবাসীরা মাওবাদীদের শরণাপন্ন হয়। কোনও এক রাতে মাওবাদী নেতা ‘নাগান্নার দলম’ গ্রামে এলে তাদের কাছে সমস্যাটা খুলে বলে গ্রামের লোকজন। সেই রাতেই সভা ডাকে মাওবাদীরা। সেখানেই স্কুল তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। মাওবাদীরা কিছু অর্থ দেয়, গ্রামবাসীরাও সাধ্যমতো অর্থ দেন। নির্মাণ শুরু হয়। কিন্তু নির্মাণ শেষ, ক্লাস শুরু হওয়া পর্যন্ত যাতে এই উদ্যোগের সঙ্গে মাওবাদীদের যোগ প্রকাশ না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকেন গ্রামবাসীরা। তাঁরা এটা পুরো গোপন রাখেন।

    এলাকার প্রাক্তন কাউন্সিলর শ্রীনিবাস বলছেন, ১৯৯১-এ স্কুল বসত ছাউনি ঢাকা কুঁড়েঘরে। বৃষ্টি হলেই স্কুল ছুটি হয়ে যেত। নাগান্নার স্কোয়াডকে জানানোর পর ওরা এই স্কুল ভবন তৈরি করে। গ্রামবাসীরাও তাঁদের শ্রম দান করেন। বেশ কয়েকবছর বাদে ২০০৫-এ সেই কুঁড়েঘর যখন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়, রাজ্যের শিক্ষা দপ্তরের কর্তারা প্রস্তাব দেন, সেটি ভেঙে নতুন কাঠামো তৈরি করে দেবেন। কিন্তু গ্রামবাসীরা প্রবল আপত্তি জানান। তাঁরা অনড় মনোভাব নেন, প্রকৃত স্কুলবাড়িটা অক্ষত রাখতে হবে। নতুন স্কুলবাড়ি তৈরি হলে অন্য জায়গা বাছাই করা হোক। মাওবাদী যোগ থাকা কাঠামো ভেঙে দেওয়ার অভিযান চালায় সরকার। প্রবল বাধা দেন গ্রামবাসীরাই।

    আজ সেই প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে একই বাড়ি থেকেই। স্থানীয় বাসিন্দা নাগেশ্বর রাওের দাবি, সেই বাড়িতে আজও পড়তে আসে ছেলেমেয়েরা। মাওবাদ নির্মূল করতে ‘অপারেশন কাগার’ অভিযানে এনকাউন্টার যেমন চলছে, তেমনই দলে দলে আত্মসমর্পণ করছে মাওবাদীরা। তার মধ্যেই মাওবাদীদের উদ্যোগে হওয়া স্কুলের কথা ফিরছে গ্রামবাসীদের মুখে মুখে।
  • Link to this news (প্রতিদিন)