• Explained: ‘কাভি হাঁ, কাভি না’! গর্ভপাত নিয়ে আড়াই বছরে বদলে গেল সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান?
    এই সময় | ০১ মে ২০২৬
  • বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল, ২০২৬), এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রায়ে ৩১ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা এক ১৫ বছর বয়সি ধর্ষিতা কিশোরীর গর্ভপাতের অনুমতি বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত জানিয়েছে, একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত পছন্দ এবং সিদ্ধান্তের উপরে সরকারের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।

    এ দিনের এই সুপ্রিম পর্যবেক্ষণের প্রেক্ষিতে চর্চায় চলে আসছে ২০২৩ সালের অক্টোবরে এই আদালতেরই দেওয়া আরও এক গর্ভপাত মামলার রায়। সেই ক্ষেত্রে এক ২৬ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা বিবাহিত মহিলাকে গর্ভপাতের অনুমতি দিয়েও পরে তা প্রত্যাহার করেছিল শীর্ষ আদালত। দুই ক্ষেত্রেই গর্ভাবস্থার মেয়াদ ২৪ সপ্তাহের বেশি। তা সত্ত্বেও আড়াই বছরের ব্যবধানে একই সুপ্রিম কোর্ট কেন ভিন্ন অবস্থান নিল?

    ধর্ষণের শিকার ১৫ বছরের ওই কিশোরীকে গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বিভি নাগরত্ন এবং বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়ার ডিভিশন বেঞ্চ গর্ভপাতের অনুমতি দিয়েছিল। আদালতে পরিবার জানিয়েছিল, পরিস্থিতির চাপে কিশোরী দু’বার আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিল।

    গত সপ্তাহের এই সুপ্রিম নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন করে কেন্দ্র। কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্য ভাটি আদালতে AIIMS-এর রিপোর্ট তুলে ধরে জানান, ৩১ সপ্তাহ কেটে যাওয়ায় চিকিৎসকেরা বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই কিশোরীর গর্ভপাত সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন।

    কেন্দ্রের বিকল্প প্রস্তাব ছিল, আর চার সপ্তাহ অপেক্ষা করে কিশোরী সন্তানের জন্ম দিক এবং তারপর সেই সন্তানকে দত্তক দেওয়া হোক।

    এই যুক্তি খারিজ করে কেন্দ্রকে কার্যত ভর্ৎসনা করেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। ঐশ্বর্য ভাটির উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘নাগরিককে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিন ম্যাডাম। আপনার কোনও অধিকার নেই এই ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার। যদি কেউ করতে পারে, সেটা হলো পরিবার’।

    বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীও স্পষ্ট জানান, চিকিৎসকদের রিপোর্ট ওই কিশোরীর পরিবারকে দেখাতে হবে। তাঁরাই সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁর গর্ভপাত করানো হবে কি হবে না।

    প্রধান বিচারপতি আরও পর্যবেক্ষণ করেন, ওই কিশোরীর জীবন না ভ্রূণ— কাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, এটা যদি তর্কের বিষয় হয়, তা হলে অবশ্যই কিশোরীকেই বেছে নেওয়া হবে।

    ২০২৩ সালের ৯ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট এক বিবাহিত মহিলাকে প্রাথমিক ভাবে গর্ভপাতের অনুমতি দিয়েছিল। তিনি ২৬ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তাঁর আরও দুই সন্তান আছে এবং ‘পোস্ট-পার্টাম ডিপ্রেশন’-সহ অন্যান্য স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা দেখিয়ে তিনি গর্ভপাতের অনুমতি চেয়েছিলেন।

    কিন্তু দু'দিন পরে, ১১ অক্টোবর সরকার AIIMS-এর একটি রিপোর্ট পেশ করে জানায়, ভ্রূণটি পরিণত (viable) এবং তার হৃৎস্পন্দন রয়েছে। এই পর্যায়ে গর্ভপাত করার অর্থ ভ্রূণের হৃৎস্পন্দন থামিয়ে দেওয়া বা অপরিণত শিশুর জন্ম দেওয়া, যা ওই শিশুর জন্য গুরুতর শারীরিক ও মানসিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। এর পরেই বিচারপতি হিমা কোহলি এবং বিচারপতি বি ভি নাগরত্নার বেঞ্চ একটি Split Verdict বা বিভক্ত রায় দিয়েছিল।

    বিচারপতি কোহলি জানান, যে ভ্রূণের প্রাণ আছে তার হৃৎস্পন্দন থামানোর আদেশ তিনি দিতে পারবেন না। অন্যদিকে, বিচারপতি নাগরত্না জানান, আবেদনকারী তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন এবং একজন অনিচ্ছুক মাকে জোর করে মাতৃত্বের দিকে ঠেলে দেওয়া অনুচিত।

    আবেদনকারীর আইনজীবী যুক্তি দিয়েছিলেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) অনুযায়ী কোনও মহিলার অধিকার গর্ভপাত আইনের (MTP Act) ঊর্ধ্বে।

    এর পরে মামলাটি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বৃহত্তর বেঞ্চে যায়। ১২ অক্টোবর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি জে বি পর্দিওয়ালা এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চ ওই মহিলার গর্ভপাতের আবেদন সরাসরি খারিজ করে দেয়।

    বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, যেহেতু মায়ের প্রাণের কোনও ঝুঁকি নেই এবং ভ্রূণটিরও কোনও বিকৃতি নেই, তাই আদালত চিকিৎসকদের একটি সুস্থ ও পরিণত ভ্রূণের হৃৎস্পন্দন থামানোর নির্দেশ দিতে পারে না।

    অর্থাৎ, আড়াই বছরের ব্যবধানে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে গর্ভপাতের দু’টি মামলার ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট দুই ধরনের রায় দিয়েছে। তাহলে কি ভারতে গর্ভপাত আইনের মধ্যেই ধোঁয়াশা আছে? আগে বুঝে নেওয়া যাক আইনটা।

    ২০২১ সালের সংশোধিত MTP Act অর্থাৎ, ‘মেডিক্যাল টার্মিনেশন অফ প্রেগন্যান্সি’ আইন অনুযায়ী:

    কেরালার মহাত্মা গান্ধী ইউনিভার্সিটির ‘স্কুল অফ ইন্ডিয়ান লিগ্যাল থট’-এর অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ডঃ আরতি পি এম-এর মতে, ভ্রূণকে একটি ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ধরা হবে কি না, তা নিয়ে ভারতীয় আইনে সত্যিই এখনও কোনও স্পষ্টতা নেই।

    তাঁর মতে, ভারতীয় সমাজে ‘প্রো-চয়েস’-এর ধারণা বস্তুগত ও রাজনৈতিক দিক থেকে খুব একটা অনুকূল নয়। ‘প্রো-চয়েস’ অর্থাৎ, মহিলাদের নিজের শরীরের উপরে অধিকার (Bodily Autonomy) এবং প্রজননের স্বাধীনতা (Reproductive Freedom)।

    আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে সুপ্রিম কোর্ট যদিও বা ‘প্রো-চয়েস’ অবস্থান নেয়, ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এর জন্য প্রস্তুতই নয়। আর বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

    সুপ্রিম কোর্টের এই দুই রায় বুঝিয়ে দিয়েছে, ভারতে গর্ভপাত সংক্রান্ত আইন নিয়ে ধোঁয়াশা নেই। তবে এই আইন ‘সাদাকালো’ নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী বিচারপতিদের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণের পরিসর দেওয়া আছে। তবে বৃহস্পতিবার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছেন: ‘সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই আইন হওয়া উচিত। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আইনেও বদল আনা উচিত’।

    এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ২৪ সপ্তাহের যে আইনি সীমারেখা টানা রয়েছে, তা কি আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সব ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক? বিশেষ করে যেখানে এক নাবালিকার ভবিষ্যৎ এবং অপরিসীম মানসিক ট্রমা জড়িয়ে আছে, সেখানে কি আইনকে আরও একটু মানবিক, নমনীয় এবং বাস্তবমুখী করার প্রয়োজন রয়েছে? সুপ্রিম কোর্টের এ দিনের কড়া পর্যবেক্ষণ কিন্তু এই প্রশ্নগুলিই নতুন করে তুলে দিল।

  • Link to this news (এই সময়)