• মতুয়া ও সংখ্যালঘু আধিক্যের বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে ভোটদানে রেকর্ড, শুরু চর্চা
    বর্তমান | ০১ মে ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: ভোটদানের হারে এবার রেকর্ড করল উত্তর ২৪ পরগনা। জেলার ৩৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে যে হারে ভোট পড়েছে, তা সাম্প্রতিককালে বিরল। বুধবার শেষ দফার ভোটে সকাল থেকেই বুথে বুথে ছিল লম্বা লাইন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই লাইন আরও দীর্ঘ হয়েছে। বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই ভোট শেষ হয়েছে। কিন্তু ভোটের হার বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট— এই নির্বাচন নিছক রুটিন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছিল না, বরং তার ভিতরে ছিল মানুষের অংশগ্রহণের তীব্র বার্তা। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে হাড়োয়া বিধানসভা কেন্দ্রে, ৯৭.৩৪ শতাংশ। জেলার নিরিখে তো বটেই, নির্বাচনি ইতিহাসেও নজরকাড়া। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই কেন্দ্রে এমন বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ রাজনৈতিক মহলে আলাদা করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভোটের আগে এসআইআর ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এই কেন্দ্রে পড়েছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। ভোটের দিন বুথমুখী মানুষের লাইন যেন সেই ষড়যন্ত্রেরই জবাব দিল। অনেকের কাছেই ভোটদান হয়ে উঠেছিল নিজের অধিকার ও উপস্থিতি নিশ্চিত করার উপায়। 

    হাড়োয়ার পরেই ভোটদানের তালিকায় রয়েছে দেগঙ্গা (৯৬.৮৫%), মিনাখাঁ (৯৬.৭৭%), বসিরহাট উত্তর (৯৬.৬২%) ও আমডাঙা (৯৬.০৩%)। সন্দেশখালি (৯৫.৮৯%) ও বসিরহাট দক্ষিণেও (৯৫.৪৪%) ভোটের হার ৯৫ শতাংশের উপরে। এই কেন্দ্রগুলির অধিকাংশই সংখ্যালঘু অধ্যুষিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই অংশগ্রহণ কেবল সংগঠনের সাফল্য নয়, বরং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রতিক্রিয়াও বটে। অন্যদিকে, বনগাঁ মহকুমার মতুয়া অধ্যুষিত চারটি কেন্দ্র— বনগাঁ উত্তর (৯২.৬১%), বনগাঁ দক্ষিণ (৯২.২৩%), গাইঘাটা (৯৩.০৮%) এবং বাগদায় (৮৯.৫১%) ভোটের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ভোটের দিন এই সব কেন্দ্রে যে আবহ তৈরি হয়েছিল, তা ছিল আক্ষেপ ও ক্ষোভে মিশ্রিত। নাগরিকত্বের প্রশ্নে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগ, আবার অনেকের ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে ভোট দেওয়ার অনুমতি— এই সব মিলিয়ে এখানে ভোটদান অনেকের কাছেই ছিল নিজের অবস্থান জানানোর মাধ্যম। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, গণতন্ত্রের এই উৎসবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জমে থাকা অভিমানও প্রতিফলিত হয়েছে। 

    এই দুই প্রবণতার পাশে শহুরে কেন্দ্রগুলির চিত্র আলাদা। বিধাননগরে ভোটের হার ৮৬.২৬ শতাংশ, জেলার মধ্যে সর্বনিম্ন। শহর ও শহরতলির কেন্দ্রগুলিতে তুলনামূলকভাবে কম ভোট পড়ার প্রবণতা নতুন নয়। সব মিলিয়ে উত্তর ২৪ পরগনার ভোটের মানচিত্র তীব্র বৈপরীত্য তুলে ধরছে। একদিকে সংখ্যালঘু ও মতুয়া অধ্যুষিত অঞ্চলে বিপুল মানুষের অংশগ্রহণ, অন্যদিকে শহুরে কেন্দ্রগুলিতে সেই সংখ্যা তুলনামূলক কম। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন হল, এই বিপুল ভোটদানের অর্থ কী? তা কি শুধুই নির্বাচনি উৎসাহ, নাকি এর ভিতরে রয়েছে গভীর কোনো বার্তা? এসআইআর ইস্যু, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা— এসবই কি ভোটারদের বুথমুখী করেছে? হাড়োয়া থেকে বনগাঁ, জেলার বিস্তীর্ণ অংশে যেভাবে ভোটাররা বুথমুখী হয়েছেন, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে ভোট এখানে কেবল রাজনৈতিক পছন্দের প্রকাশ নয়, বরং পরিচয়, অধিকার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগেরও প্রতিফলন।
  • Link to this news (বর্তমান)