শুভঙ্কর বসু, কলকাতা: ‘হ্যালো স্যার, এক্ষুণি আসুন। সন্ত্রাস করতে প্রচুর বহিরাগত ঢুকেছে!’ ভোটের আগের রাত। কমিশনের কন্ট্রোল রুম। ফোনের সামনে বসে রাত জাগছিলেন পদস্থ কর্তারা। টেলিফোন পেতেই শুরু দ্রুত তৎপরতা। বিশেষ পর্যবেক্ষকের নেতৃত্বে রেইড কমিশনের। সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী। নীলবাতি গাড়ি। হুটার বাজিয়ে ঘিরে ফেলা হয় আস্ত বাড়ি। ‘এটাই লোকেশন!’ স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে এগিয়ে যান জওয়ানরা। ‘খবর একেবারে পাক্কা!’ কারণ বাড়ির ভিতরে তখন প্রচুর লোকজন! ‘হ্যান্ডস আপ!’
ঘরময় রজনীগন্ধার গন্ধ! হাসির রোল হঠাৎ মিউট। ক্যামেরাম্যানের হাত কাঁপছে। লাল বেনারসি পরা তরুণী তখন ঠকঠক করছে কাঁপছেন। তরুণের মাথায় টোপর। ধুতির কোঁচা যত্নে ভরা পাঞ্জাবির পকেটে। তাঁর চোখ ছানাবড়া। গাল ফুলিয়ে সানাই বাজানো শিল্পী থেমে গেলেন। অনেকের হাতে তখন মটন, বিরিয়ানি, কারও প্লেটে গরম ফিসফ্রাই। আধিকারিকের কানের কাছে গিয়ে একজন বললেন, স্যার, বহিরাগত কোথায়? কমিশন ততক্ষণে টের পেয়েছে। ভুল জায়গায় রেইড। এ তো বিয়ের অনুষ্ঠান! লুকিয়ে তখন জিভ কাটছেন অনেকে। বিশেষ পর্যবেক্ষক এগিয়ে গেলেন নিজেই। বললেন, সরি। কিছু মনে করবেন না। আমরা বহিরাগত ঢোকার খবর পেয়ে এসেছিলাম!
তখন সম্বিত ফিরল বর ও কনেপক্ষের! তাঁরাও ভেবেছিলেন, বিয়ের আসরে হঠাৎ, এত বাহিনী কেন? কনেপক্ষ ভেবেছিলেন, বরপক্ষ বোধহয় প্রভাবশালী। এই বাহিনী তাঁদেরই অতিথি। বরপক্ষ ভেবেছিলেন, ঠিক উল্টোটি। কিন্তু পরে বুঝলেন, তাঁরা নিজেরাই অতিথি হয়ে এসেছেন। মঙ্গলবার রাতে এমনই ঘটনার সাক্ষী থাকল লেকটাউন। রেইড করতে হাজির হয়েছিলেন বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত এবং বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক এন কে মিশ্র। তবে অতিথি তো নারায়ণ। তাই না খেয়ে যাওয়া যাবে না। বর-কনেপক্ষ আবদার করে বললেন স্যার, এসেই যখন পড়েছেন। বিয়েবাড়িতে খেয়েই যান। ‘আরে, না না। আমরা চলে যাচ্ছি। আপনাদের শুভেচ্ছা রইল।’ কমিশনের আধিকারিকরা তখন পালাতে পারলে বাঁচেন।
কিন্তু বর-কনেপক্ষ অতিথিদের ছাড়তে নারাজ। কেউ প্লেট নিয়ে বলেন, ‘অল্প একটু বিরিয়ানি দিই।’ সঙ্গে সঙ্গে পাশ থেকে আরও একজন দৌড়ে এসে বলেন, ‘স্যার, ফিসফ্রাই এখনও গরম। অন্তত একটি দি। কিছু না খেয়ে গেলে অমঙ্গল হবে স্যার।’ এবার সরাসরি আকুতি মেয়ের বাবার। ‘অন্তত, মিষ্টিমুখ করে যান।’ মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই প্লেটে হাজির মিষ্টি। জলের বোতল। আধিকারিকরা মুখে মিষ্টি তুলতে পারলেন না। এত বড় ভুল? রাগে গজগজ করছেন তাঁরা। মনে মনে ভাবছেন, কে টেলিফোন করল, তাঁকে খুঁজে বের করতে হবে! এতটা প্রেস্টিজ লস! বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় তাঁরা জল খেলেন শুধু।
রেইড ব্যর্থ। নীলবাতি চড়ে ফিরে গেল কমিশন। হুটারের শব্দ মিলিয়ে যেতেই ছন্দ ফিরল অনুষ্ঠানের। মন্ত্র পড়তে শুরু করলেন পুরোহিতমশাই, ‘যদিদং হৃদয়ং তম...। বেজে উঠল বিয়ের সানাই!