'লোকে বলত আর দল পেলি না!' শমীকের লড়াই জানলে চোখে জল আসবে আপনারও
আজ তক | ০৯ মে ২০২৬
বাংলায় বিজেপির ঐতিহাসিক উত্থান। অনেকেই বলছেন, এর নেপথ্যে অন্যতম অবদান যাঁর, তাঁর নাম শমীক ভট্টাচার্য। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসনে জিতে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার সরকার গঠনের পথে বিজেপি। আর এই রাজনৈতিক পালাবদলের পিছনে সংগঠন, কৌশল এবং বুথস্তরের লড়াইয়ে অন্যতম মুখ ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, দীর্ঘদিনের সংগঠক শমীকই বাংলায় বিজেপিকে ক্ষমতার দরজায় পৌঁছে দিয়েছেন। ঠান্ডা মাথায় আদি ও নব্য বিজেপির মিলন ঘটিয়েছেন। দলকে আরও ঘষে-মেজে তৈরি করেছেন।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে বিজেপির রাজ্য সভাপতি পদে বসেন শমীক ভট্টাচার্য। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি বুথ স্তরে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর উপর জোর দেন। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ, শহর থেকে গ্রাম; প্রায় প্রতিটি জেলায় একাধিক বৈঠক করেন। দলীয় কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখেন। বিজেপির অন্দরের পুরনো ও নতুন গোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শমীক বুঝেছিলেন যে, বাংলায় বিজেপিকে এগোতে হলে যেমন নতুন নেতাদের দাপট প্রয়োজন, ঠিক তেমনই পুরনোদের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগাতে হবে। তার কারণ, শমীকের নিজেরও গেরুয়া সফর বেশ দীর্ঘ।
১৯৭১ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা RSS-এ যোগ দিয়ে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেন শমীক। পরে আশির দশকের শুরুতে বিজেপিতে যোগ দেন।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে শমীক নিজেই বলেছিলেন, 'সেই সময় বাংলায় বিজেপির তেমন কিছুই ছিল না। পাড়ার লোক, বন্ধুবান্ধবও মজা করে বলত, আর দল পেলি না! শেষমেশ বিজেপি?' সেই সময়ের ছোট সংগঠন থেকেই ধীরে ধীরে উঠে আসেন তিনি।
নব্বইয়ের দশকে বিজেপি যুব মোর্চার দক্ষিণ হাওড়া মণ্ডলের সাধারণ সম্পাদক হন। পরে হাওড়া জেলা এবং রাজ্য স্তরেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। দীর্ঘ ১১ বছর বিজেপি যুব মোর্চার রাজ্য সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলেছেন। পরে তিন দফায় বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেন।
ভোটের রাজনীতিতে শুরুটা খুব সহজ ছিল না। ২০০৬ সালে শ্যামপুকুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে পরাজিত হন। ২০১৪ সালে বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রেও হারতে হয়। তবে সেই বছরই বসিরহাট দক্ষিণ বিধানসভা উপনির্বাচনে জয় পান। সেই সময় তিনি ছিলেন বিধানসভায় বিজেপির দ্বিতীয় বিধায়ক। যদিও ২০১৬ সালে ফের তৃণমূলের কাছে হারতে হয় তাঁকে।
২০১৯ সালে দমদম লোকসভা কেন্দ্রেও জয় পাননি শমীক। কিন্তু দলের অন্দরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বরাবরই ছিল। বিজেপির প্রধান মুখপাত্র হিসাবেও তিনি পরিচিত ছিলেন। তাঁর শান্ত স্বভাব, পরিমার্জিত ভাষণ এবং সাংগঠনিক দক্ষতা তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেয়।
২০২৪ সালে রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন শমীক ভট্টাচার্য। এরপর তাঁকে কল্যাণীর AIIMS-এর সদস্য হিসাবেও দায়িত্ব দেওয়া হয়। কাশ্মীরের পহেলগাঁও হামলার পর অপারেশন সিঁদুর নিয়ে ভারতের অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরতে ইউরোপ সফরেও যান। সেই প্রতিনিধি দলে ছিলেন রবিশঙ্কর প্রসাদও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শমীকের সবচেয়ে বড় সাফল্য ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন। দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের মধ্যেই বিজেপিকে বাংলার ক্ষমতায় পৌঁছে দেওয়া নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। বুথভিত্তিক সংগঠন শক্তিশালী করা, হিন্দু ভোটকে একজোট করা এবং বিরোধী ভোটের সমীকরণ ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি।
বিজেপির অন্দরের একাংশের দাবি, শমীকের নেতৃত্বে দল শুধু নির্বাচনে জেতেনি, বাংলায় নিজেদের স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তি হিসাবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। দীর্ঘদিনের বাম ও তৃণমূল রাজনীতির পর বাংলায় পদ্মফুল ফোটার পিছনে তাই এখন সবচেয়ে চর্চিত নাম শমীক ভট্টাচার্য।