সূর্যকান্ত কুমার, কালনা
রাত দুটোর সময়েও নিঝুম গ্রামে আলো জ্বলছে একটা ঘরে। ওই ঘরে এক কিশোর মগ্ন বইয়ের পাতায়। এ ছবি প্রতিবেশীদের কাছে হয়ে গিয়েছিল চেনা। নদিয়ার নৃসিংহপুরের সেই ছেলে সাগর মণ্ডল এ বার উচ্চ মাধ্যমিকে নবম হয়েছে, পড়ত কালনা মহারাজা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। আমেদাবাদ থেকে শনিবার রাতে মায়ের সঙ্গে বাড়ি ফিরেছে সে। রবিবার সেখানেই কথা হলো সাগরের সঙ্গে। দৃঢ়তার সঙ্গে জানাল, আইএএস অফিসার হওয়াই তাঁর লক্ষ্য।
ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাবা মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল ও মা সুষমা মণ্ডল বছর দুয়েক আগে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে পাড়ি দিয়েছেন আমেদাবাদে। গত এপ্রিল মাসে সেখানে যায় সাগরও, একটি হোটেলে যোগ দেয় সাফাইকর্মী হিসেবে। রবিবার বাড়িতে বসে সাগর জানাল, কেন সে আইএএস অফিসার হতে চায়। সাগরের কথায়, 'বহু সরকারি প্রকল্পের কথা সাধারণ মানুষ জানেন না। সরকারি প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন, দুর্নীতি রোধের মতো কাজ করার জন্য আইএএস হতে চাই।'
এর জন্য তার অনুপ্রেরণা সুভাষচন্দ্র বসু থেকে আজকের নীতিন সিংহানিয়া। সাগর বলল, 'কালনার প্রাক্তন মহকুমাশাসক নীতিন সিংহানিয়ার আইএএস প্রবেশিকার বই সারা ভারতে বিখ্যাত। ওই বই কিনে আমি প্র্যাকটিসও শুরু করে দিয়েছি।' তবে পরবর্তী পড়াশোনা নিয়ে একটু দোটানায় রয়েছে নৃসিংহপুরের মেথিরডাঙার এই কিশোর। বলল, 'কয়েক জন বলেছেন, স্নাতকে এখানেই ভর্তি হতে। কিন্তু আমি দিল্লিতে আইএএসের কোচিং নিতে চাই। তাই ভাবছি, দিল্লিতে মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে একটা কাজও করব, আর প্রশিক্ষণও নেব। দেখি।'
দুই দিদি আর মা-বাবাকে নিয়ে সাগরদের পরিবার। ইতিমধ্যে দুই দিদি বন্দনা ও মৌসুমির অবশ্য বিয়ে হয়ে গিয়েছে। সাগরের সাফল্যের পিছনে ওর মায়ের অবদানও অনন্য। সাগরের যখন মাত্র ১১ মাস বয়স, তখন মৃত্যু হয় মা মণিকা মণ্ডলের। এমন শিশুসন্তানের দেখভালের জন্য বছর খানেকের মধ্যে ফের বিয়ে করেন বাবা মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল। তখন থেকেই নিজের সন্তান না-হলেও তিন ছেলেমেয়েকে বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন সুষমা মণ্ডল, হয়ে উঠেছেন ওদের নিজের মা। স্বামীর সঙ্গে আমেদাবাদে যাওয়ার পর থেকে ফোনে তিনি নজর রাখতেন ছেলের পড়াশোনার। সাগরের কথায়, 'বাবার থেকে বেশি।' সাগরের বড় দিদি বন্দনা বললেন, 'উনি কখনও বুঝতে দেননি, আমাদের সৎমা। আমাদের কথা ভেবে নিজে সন্তান নেননি।' পাশে বসে সুষমা বললেন, 'ওরাই তো আমার সন্তান। সাগরের এমন সাফল্যের পর নিজেকে অনেকটা হালকা লাগছে।'
এই সাফল্য সম্পর্কে সাগরের বাংলার গৃহশিক্ষক নৃসিংহপুরেরই বাসিন্দা শৌভিক ঘোষ বললেন, 'পড়া ও নিখুঁত ভাবে বুঝত। প্রচণ্ড জেদি।' এই জেদের পরিচয় সাগর দিয়েছে মা-বাবা আমেদাবাদে চলে যাওয়ার পরে একা বাড়িতে থেকে নিজের দায়িত্বে পড়াশোনা করে। বাড়িতে জলের সংযোগ নেই। পাড়ার কল থেকে জল আনা, রান্নাও নিজেই করত। দিদি বন্দনা বললেন, 'ভাই পড়ার জন্য কাউকে রেয়াত করত না। কখনও কখনও আমাদেরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তখন খারাপ লাগলেও এখন আনন্দ হচ্ছে।' মা সঙ্গে এলেও এই আনন্দের অংশীদার হতে বাড়ি ফিরতে পারেননি সাগরের বাবা। তিনি ফোনে বললেন, 'খারাপ তো লাগছেই। তবে এখন আমি ফিরলে সংসার চলবে না। তাই স্ত্রীকে পাঠিয়েছি। ওকেই বলেছি, ছেলের ভর্তির ব্যবস্থাটা করে আসতে।'