এই সময়: এক দিকে শিক্ষাকে স্বশাসন এবং রাজনীতি মুক্ত করার বার্তা, আর অন্য দিকে শিক্ষা আসলে কী, কী ভাবে দেশ ও রাজ্যকে মেধাবীরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন— সেই রোডম্যাপও রইল মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক সমেত বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষায় কৃতী পড়ুয়াদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। রাজ্যে নয়া সরকার গঠিত হওয়ার পরে এই প্রথম কৃতী পড়ুয়াদের সংবর্ধনা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দ্ু অধিকারী। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যও। শমীক এবং শুভেন্দু দু’জনের বক্তব্যেই উঠে এসেছে আগামী দিনে রাজ্যের শিক্ষাকে এগিয়ে দেওয়ার নানা সমীকরণ।
রাজ্যে শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা ক্ষেত্রে স্খলনের অভিযোগ জমেছিল গত কয়েক দশক ধরে। উচ্চশিক্ষা ও চাকরির খোঁজে রাজ্যের মেধাবী পড়ুয়াদের ভিন রাজ্যে পাড়ি দেওয়ার সূত্রে ‘ব্রেন ড্রেন’–এর অভিযোগ গত কয়েক বছরে বারবার উঠেছে। সেই উদ্বেগকেও নিজের বক্তব্যে ছুঁয়ে যান শমীক। মুখ্যমন্ত্রীও অভয় দেন, রাজ্যের শিক্ষার বিশেষ করে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নে তাঁর সরকার কোনও কাপর্ণ্য করবে না। এ দিনের অনুষ্ঠানে সংবর্ধনা দেওয়া হয় মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা, আইসিএসই, সিবিএসই-তে দুর্দান্ত ফল করা পড়ুয়াদের।
বিশ্বের জ্ঞান–বিজ্ঞান চর্চায় ভারতের ঐতিহ্য এবং অবদানকে উদাহরণ হিসেবে তুলে আনেন শমীক। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটা দেশে জন্মগ্রহণ করেছি, যে দেশ সারা পৃথিবীকে শিক্ষার আলো দেখিয়েছে। সে দেশ শুধু বিদ্যা দান করেনি— এই যে আমরা কথা বলছি, আমরা ব্যাকরণ চর্চা করছি, তার উৎস কিন্তু এই ভারতবর্ষ।’ শুধু ব্যাকরণ নয়, ত্রিকোণমিতি, জ্যামিতি, সংখ্যাতত্ত্ব থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান, রিডাকশন গিয়ারের কনসেপ্ট— এই ভারতের পুণ্যভূমি থেকেই যে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা উদাহরণ দিয়ে তুলে ধরেন তিনি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার অথবা ভোটের ব্যালটের ক্ষেত্রে অথবা বিবাহ প্রথার জন্মদাতা হিসেবেও কৃতীদের সামনে ভারতের ঐতিহ্য ও অবদানের কথা মনে করিয়ে দেন ইতিহাসের নানা ঘটনাকে সামনে এনে। যৌবনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা পড়ুয়াদের উদ্দেশে শমীক বলেন, ‘আমরা যারা এখানে আছি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দেখছি, নতুন নতুন সরকার দেখছি। সরকার আসবে, চলে যাবে। একটা দল তৈরি হবে, দল শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু ভারতের মাটির যে মূল তত্ত্ব— ‘একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি’ —যে কথা নিয়ে আজকে আমাদের সমাজ, এই চলমান সমাজ এগিয়ে চলেছে।’ অর্থাৎ বহুত্ববাদের কথা মনে করিয়েও ‘একতা’র বার্তা দিতে ভোলেননি তিনি।
ব্রেন ড্রেন আটকাতে দেশের মেধাকে দেশের কথা মনে করিয়ে দিতে আগামী প্রজন্মের কাছে তাঁর আবেদন, ‘আপনারা প্রত্যেকে নিজস্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হোন। আপনারা দেশে থাকবেন, দেশের বাইরে যাবেন, কিন্তু তার মধ্যেও মনে রাখতে হবে— আমরা যাঁরা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা আছি, আমরা প্রথমে ভারতীয়, তারপরে আমরা একজন বাঙালি।’ অবশ্য এই বাঙালিয়ানার মধ্যেও ছিল অন্তর্ভুক্তির স্পষ্ট বার্তা। তাঁর কথায়, ‘পশ্চিমবঙ্গে বাস করে বাংলা ভাষায় কথা বললেই যে তিনি বাঙালি, এর কোনও অর্থ নেই। যাঁরা বাড়িতে হিন্দি ভাষায় কথা বলেন, ওড়িয়ায় কথা বলেন, রাজস্থানের ভাষায় কথা বলেন— কিন্তু কয়েক পুরুষ ধরে যাঁরা এই বাংলার মাটিতে তার আর্থ-সামাজিক উত্তরণের জন্য কাজ করে চলেছেন, তাঁরাও বাঙালি।’ আর পশ্চিমবঙ্গের বাইরে দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা সেই সমস্ত বাঙালি ও বাংলার শুভানুধ্যায়ীদের কাছে টানতে কৃতী ছাত্রছাত্রীদের ‘টাস্ক’-ও দিয়েছেন সাংসদ। শমীকের কথায়, ‘পশ্চিমবঙ্গবাসীরা যাঁরা বিভিন্ন প্রান্তে আছেন, আপনাদের আত্মীয়রা আছেন, আপনাদের বন্ধু, দাদা, কাকা, জেঠামশাইরা আছেন— সকলকে একটা ফোন করে বলবেন যে, পশ্চিমবঙ্গে আসুন, পশ্চিমবঙ্গে ইউনিভার্সিটি তৈরি করুন, পশ্চিমবঙ্গে বড় শিল্প তৈরি করুন, পশ্চিমবঙ্গে নতুন নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করুন। আমাদের মেধার বিকাশ ঘটান।’
শমীকের এ দিনের বক্তৃতাকে সম্মান জানিয়ে নিজের ভাষণের একেবারে শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী তাকে ‘উচ্চমানের ভাষণ’ বলে অভিহিত করতে কার্পণ্য করেননি। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও কৃতীদের বার বার স্বামী বিবেকানন্দের কথা শুনিয়েছেন, বিদ্যাসাগরের আদর্শে যে তাঁদের সরকার চলবে— সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। পড়ুয়াদের পরামর্শ দিয়েছেন, প্রাক্তন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের বক্তৃতা শুনতে, সেখান থেকে শিক্ষা নিতে। শুভেন্দুর কথায়, ‘শিক্ষা ছাড়া আমরা কখনওই চেতনার মুক্তি ঘটাতে পারি না, আর চেতনার মুক্তি ঘটানোর মধ্য দিয়েই আধুনিক বাংলা তৈরি হতে পারে।’
বাংলার মেধাকে সম্মান জানিয়ে তাঁর সংযোজন, ‘এই বাংলায় এত এত মেধাসম্পন্ন লোকজন রয়েছে, যাঁরা ইউরোপের ইউনিভার্সিটিগুলোতে গিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আমরা চাইব, আমাদের সরকারের লক্ষ্য— মেধা আমাদের কাছেই থাকুক, সেই মেধাকে কাজে লাগিয়ে উন্নত বাংলা, প্রকৃত সোনার বাংলা, কবিগুরুর ভাবনায় বাংলা, স্বামী বিবেকানন্দের স্বপ্নের বাংলা আগামী দিনে যাতে আমরা তৈরি করতে পারি।’ আর সেই কারণে রাজনীতিমুক্ত শিক্ষা গড়ার অঙ্গীকারও করেন শুভেন্দু। ক্যাবিনেট মিটিং শেষ করে এই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই প্রসঙ্গ টেনে কৃতী পড়ুয়া এবং অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সমস্ত ধর্মীয় ভাতা বন্ধ করে বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ যোজনা চালু করা হবে। ওই অর্থে আমাদের অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে, দল-মত নির্বিশেষে, তাঁদের অভিভাবকরা মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে, শিক্ষা দপ্তরে যোগাযোগ করবেন।’ এ দিন পড়ুয়াদের উপহারে ল্যাপটপ ছাড়াও তুলে দেওয়া হয় স্বামী বিবেকানন্দর ছবি, স্বামীজির লেখা ‘অামার ভারত, অমর ভারত’ বই এবং ফুল মিষ্টিও।