এই সময়, বালি: রবিবার গভীর রাতে বালিতে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলো অনলাইন খাবার সরবরাহ সংস্থার কর্মীর। ২১ বছরের তরতাজা তরুণ মৃত জয়দীপ হালদার বেলুড় লালবাবা কলেজের বিকম চূড়ান্ত বর্ষের ছাত্র। রবিবার গভীর রাতে একটি মোমো চেন আউটলেট থেকে গ্রাহকের খাবার সংগ্রহ করে সরবরাহ করতে যাওয়ার সময়ে বেপরোয়া ডাম্পারের ধাক্কায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান জয়দীপ। ঘাতক ডাম্পারের চালক ও দুই খালাসিকে আটক করেছে পুলিশ। আটক করা হয়েছে ডাম্পারটিও।
মাত্র বছরখানেক আগে বালিতে এ রকমই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গভীর রাতে বাদামতলার কাছে জিটি রোডে দৈত্যাকার সিমেন্ট মিক্সিং মেশিনবাহী ডাম্পারের ধাক্কায় পিষে গিয়েছিল একটি হলুদ ট্যাক্সি। ঘটনাস্থলে ট্যাক্সি চালক–সহ সওয়ারি তরুণ ইঞ্জিয়ার প্রাণ হারিয়েছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, কী দিন বা রাত, স্বল্পপরিসর জিটি রোড দিয়ে অনবরত ছুটে চলে দৈত্যাকার ভারী মালবাহী গাড়ি। বিশালাকার ট্রেলার ও ডাম্পারের মতো বড় চাকার বিপজ্জনক গাড়িও হামেশা চলাচল করে। এরই মধ্যে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে অনলাইন খাবার ও অন্য সামগ্রী ডেলিভারি করার জন্য ডেলিভারি বয়দের ছুটতে হয় দু’চাকায়। সংস্থার ডেলিভারি সংক্রান্ত নিয়ম মানতে গিয়ে নির্দিষ্ট সময় সাত মিনিট বা ১০ মিনিটের মধ্যে গ্রাহকের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ছেন ডেলিভারি বয়রা। গ্রাহকের বিরূপ মন্তব্য ও নেগেটিভ রেটিংয়ের আতঙ্ক তাড়া করে ফেরে ডেলিভারি বয়দের। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সমাজমাধ্যমে ও রাজনৈতিক পরিসরে নানা প্রশ্ন উঠছে। অনলাইন পরিষেবার ক্ষেত্রে সঠিক নীতি নির্ধারণের দাবিও উঠছে নানা পক্ষ থেকে। তা সত্ত্বেও কোনও রকম সুরক্ষা ছাড়াই খাবার সরবরাহকারী সংস্থা–সহ অন্য সংস্থার ডেলিভারি বয়দের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে কাজে বিরাম নেই।
সোমবার মৃত জয়দীপ হালদারের আত্মীয়রা জানিয়েছেন, লালবাবা কলেজে স্নাতক স্তরে পড়াশোনার পাশাপাশি সংসারের সুরাহার জন্য সকাল–সন্ধে কাজ করতে হতো জয়দীপকে। তিনি সকালে একটি নামী কেক সংস্থার আউটলেটে কাজ করতেন। দিনের বেলা পড়াশোনা ও কলেজ শেষ করে সন্ধ্যা থেকে বেশি রাত অবধি ফুড ডেলিভারি বয় হিসেবে কাজ করতেন। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের একমাত্র সন্তান জয়দীপের বাবা পঞ্চানন হালদার পেশায় ভ্যানরিকশা চালক। কোনও রকমে ঘুসুড়ির শিবগোপাল ব্যানার্জি লেনের এক চিলতে ভাড়া ঘরে ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর ছোট সংসার। কষ্টের সংসারে ছেলেকে লেখাপড়াও শিখিয়েছেন। কয়েক বছর আগে বেলুড় বয়েজ় হাইস্কুল থেকে ভালো ভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ হয়ে জয়দীপ লালবাবা কলেজের বাণিজ্য শাখায় পড়াশোনা করছিলেন। পাশ করে চাকরি জোগাড় করে সংসারের হাল ধরার লক্ষ্য ছিল জয়দীপের। ‘সব শেষ হয়ে গেল,’ আক্ষেপ মামা কার্তিক শিকদারের।
রবিবার রাত ১১টা নাগাদ বাড়িতে ফোন করে জয়দীপ মাকে জানিয়েছিলেন, আর একটি ডেলিভারি বাকি। সেটি করেই তিনি বাড়ি ফিরবেন। ছেলের পথ চেয়েছিলেন মা। কিন্তু ছেলের আর বাড়ি ফেরা হলো না। জয়দীপের এক আত্মীয়া সুস্মিতা শিকদার জানিয়েছেন, রাত ১২টাতেও জয়দীপ বাড়ি না ফেরায়, তাঁর মা ছেলের মোবাইলে ফোন করতে থাকেন। কিন্তু তিনি ফোন তোলেননি। বেশ কিছুক্ষণ পরে আবার ফোন করলে থানা থেকে দুর্ঘটনার খবর জানানো হয়। রাতেই খাবার সরবরাহকারী সংস্থার জয়দীপের সহকর্মী অন্য ডেলিভারি বয়রা বালি থানায় হাজির হন। তাঁদের অনেকে ক্ষোভের সঙ্গে জানান, নেহাতই পেটের দায়ে সংসারে সাহায্যের জন্য তাঁদের এ ভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। অথচ, সংস্থা থেকে কোনও রকম সুরক্ষা পান না তাঁরা। এমনকী, জয়দীপের মৃত্যুর খবর পেয়েও খাদ্য সরবরাহকারী সংস্থার পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করেননি পরিবারের সঙ্গে।
এই মৃত্যুতে ফের মুহূর্তের মধ্যে খাবার বা অন্য সামগ্রী সরবরাহের ব্যবসার বৈধতা ও নৈতিক মান নিয়ে প্রশ্ন উঠল। যানজট ও রাস্তার অজানা বিপদ মোকাবিলা করে মুহূর্তের মধ্যে খাবার বা সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার এই বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা কতটা মানবিক বা কতটুকু ন্যায্য, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে ঘনবসতি এলাকার মধ্যে দিয়ে যাওয়া জিটি রোড দিয়ে ভারী মালবাহী গাড়ি ও ডাম্পারের মতো বিপজ্জনক গাড়ি চলাচল করার অনুমতি আর কত দিন চলবে, সে প্রশ্নও উঠেছে। পাশাপাশি, অনলাইন খাদ্য সামগ্রী সরবরাহ সংস্থাগুলির অমানবিক নিয়ম ও ডেলিভারি বয়দের সুরক্ষা কবচ নিয়ে সোচ্চার ট্রেড ইউনিয়ন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলি। এ নিয়ে নাগরিক মঞ্চের সম্পাদক নব দত্ত ‘এই সময়’–কে বলেন, ‘খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে গিগ ওয়ার্কারদের নিয়ে এখনও কোনও সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি নেই। গোটা বিশ্বজুড়েই এই সমস্যা। আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন খুব শীগগির এই প্রশ্নে সম্মেলন করছে। আমরা নতুন রাজ্য সরকারকে আমাদের প্রস্তাব দেবো।’