• বিপুল ঋণে জর্জরিত বঙ্গ, সপ্তম পে কমিশনে যতটা বাড়বে বেতন, ততটা চাপ কোষাগারে
    eTV Bharat | ১৯ মে ২০২৬
  • সপ্তম পে কমিশন বাস্তবায়ন, 37 শতাংশের উচ্চ ঋণ-জিডিপি অনুপাত এবং অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের কারণে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার এক বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। বিপুল ঋণ এবং সপ্তম বেতন কমিশনের মতো জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি— উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ।

    দীর্ঘ 15 বছর পর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটেছে৷ কিন্তু, রাজ্যের নতুন সরকারের জন্য বঙ্গের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। 20 লক্ষ কোটি টাকারও বেশি অর্থনীতির রাজ্যের কোষাগার বর্তমানে প্রবল চাপের মধ্যে রয়েছে। সপ্তম বেতন কমিশন চালুর মতো বড় প্রতিশ্রুতি, কোষাগারে বিপুল ঋণের চাপ এবং 'অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার'-এর মতো জনকল্যাণকারী প্রকল্পগুলি রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতিকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে চলেছে। চলুন, বঙ্গের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজ্যের নতুন সরকারের সামনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলি বুঝে নেওয়া যাক।

    সরকারি কোষাগারের বর্তমান অবস্থা কী?

    পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এক অত্যন্ত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ষোড়শ অর্থ কমিশনের মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাজ্যের ঋণ-থেকে-জিএসডিপি অনুপাত প্রায় 37 শতাংশের এক বিপজ্জনক পর্যায়ে রয়েছে। ঋণের বোঝা রাজ্য সরকারের মোট আয়ের প্রায় তিনগুণ। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল, সরকারের মোট আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শুধুমাত্র কর্মচারীদের বেতন, পেনশন এবং পুরনো ঋণের সুদ পরিশোধেই খরচ হয়ে যায়। রাজ্য সরকার একটি পুরনো পেনশন প্রকল্প চালু করছে, যা সরকারি কোষাগারের দায় বা চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে।

    বঙ্গে সপ্তম বেতন কমিশন চালুর প্রভাব সরকারি কোষাগারের উপর কতটা পড়বে?

    বিজেপি নতুন সরকার গঠনের 45 দিনের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে সপ্তম বেতন কমিশন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বর্তমানে, রাজ্য সরকার ষষ্ঠ বেতন কমিশন (ROPA 2019) কাঠামোর অধীনে কাজ চালাচ্ছে এবং রাজ্য ও কেন্দ্রীয় কর্মচারী এবং পেনশনভোগীদের মহার্ঘ ভাতা ও মহার্ঘ ত্রাণের (DA-DR) মধ্যে 36 শতাংশ থেকে 40 শতাংশের একটি বিশাল ব্যবধান রয়েছে। সপ্তম বেতন কমিশন সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করা এবং সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী পুরোনো DA-DR বকেয়া পরিশোধ করার ফলে প্রতি বছর রাজ্যের কোষাগারের উপর হাজার হাজার কোটি টাকার (আনুমানিক 20 থেকে 25 হাজার কোটি টাকার) অতিরিক্ত বোঝা বাড়বে। এটি নতুন সরকারের জন্য একটি বড় আর্থিক চাপ তৈরি করবে। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার কীভাবে এর মোকাবিলা করে, সেটাই এখন দেখার।

    অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার রূপান্তর সরকারি কোষাগারকে কীভাবে প্রভাবিত করবে?

    পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জীর পূর্ববর্তী সরকারের আমলে, 'লক্ষ্মী ভাণ্ডার' প্রকল্পের মাধ্যমে 2.21 কোটিরও বেশি মহিলাকে মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হতো, যার জন্য বার্ষিক রাজ্য বাজেট ছিল প্রায় 26,700 কোটি টাকা। বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই প্রকল্পটিকে 'অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার' পর্যন্ত প্রসারিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই প্রকল্পের নগদ বরাদ্দ দ্বিগুণ করার অর্থ হল, নতুন সরকারকে শুধুমাত্র এই প্রকল্পের জন্যই বছরে 50,000 কোটি টাকার বেশি সংগ্রহ করতে হবে। উন্নয়ন বাজেটে কাটছাঁট না করে এত টাকা সংগ্রহ করা আর্থিকভাবে অসম্ভব।

    পশ্চিমবঙ্গে ষষ্ঠ বেতন কমিশন কবে কার্যকর হয়েছিল?

    পশ্চিমবঙ্গে ষষ্ঠ বেতন কমিশন কার্যকর সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও ঘোষণাগুলি দেখে নেওয়া যাক:

    27 নভেম্বর 2015: অধ্যাপক অভিরূপ সরকারের নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ষষ্ঠ বেতন কমিশন গঠিত হয়৷ ওইদিন বেতন ও ভাতাগুলির সংশোধনের কাজের পরিধি নির্ধারিত হয়৷

    1 জানুয়ারি 2016: এই তারিখ থেকে পূর্ববর্তী সময়ের ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণ কার্যকর করা হয়৷

    23 সেপ্টেম্বর 2019: পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভা সুপারিশগুলি বাস্তবায়নের অনুমোদন দেয়৷

    25 সেপ্টেম্বর 2019: সরকারিভাবে ROPA বিধিমালা, 2019 বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা হয়৷

    পশ্চিমবঙ্গে সপ্তম বেতন কমিশনের বাস্তবায়ন মূলত রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা সংশোধনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বেতন কমিশন কেবল মাসিক আয়ের ওপরই নয়, বরং অবসরকালীন সুবিধা, ব্যয়ের সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ওপরও প্রভাব বিস্তার করে। উল্লেখিত গুরুত্বপূর্ণ তারিখ ও বিষয়গুলি বিবেচনায় রেখে, সপ্তম বেতন কমিশনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি পর্যালোচনা করে কীভাবে এর বাস্তবায়ন পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারীদের বেতন, পেনশন ও অন্যান্য পাওনাকে আমূল বদলে দিতে পারে, তা বুঝে নেওয়া যাক।

    সপ্তম বেতন কমিশনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট

    সংশোধিত বেতন কাঠামো:

    রাজ্যে বর্তমান ষষ্ঠ বেতন কমিশনের পুরোনো কাঠামো সপ্তম বেতন কমিশন দ্বারা প্রতিস্থাপিত হতে চলেছে, যা বেতন স্তর এবং কর্মদক্ষতাকে কর্মজীবনের অগ্রগতির সঙ্গে সংযুক্ত করবে।

    ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর:

    এই গুণকটি সংশোধিত মূল বেতন গণনার কাজে ব্যবহৃত হয় এবং যেকোনও বেতন কমিশনের অন্যতম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণকৃত উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। সপ্তম বেতন কমিশন 2.57-এর একটি অভিন্ন ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর সুপারিশ করেছিল। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে, সপ্তম বেতন কমিশন বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, সেটাই এখন দেখার।

    ভাতার পুনর্বিন্যাস:

    বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মহার্ঘ ভাতা, বাড়ি ভাড়া ভাতা, যাতায়াত ভাতা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতাগুলি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। এটি রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের মুদ্রাস্ফীতির মোকাবিলা করতে কার্যকরভাবে সহায়তা করবে।

    পেনশনের ওপর প্রভাব:

    সংশোধিত এই কাঠামোটি অবসরকালীন সুবিধাগুলি, কর্মরত কর্মীদের বেতন এবং অবসরপ্রাপ্ত রাজ্য সরকারি কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত পেনশন দেওয়ার বিষয়গুলিকেও প্রভাবিত করতে পারে৷ এর ফলে এটি কর্মরত সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগী— উভয় পক্ষের জন্যই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

    সরল বেতন কাঠামো:

    তাই একটি সুবিন্যস্ত বেতন ব্যবস্থা স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করতে পারে, বেতন ও পেনশন বাড়াতে পারে এবং বিভিন্ন কর্মীশ্রেণির মধ্যে বিভ্রান্তি দূর করতে পারে। যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে, এটি কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানও উন্নত করতে পারে।

    সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর হলে বেতন কতটা বাড়তে পারে?

    বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মচারীদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় হার অনুযায়ী ডিএ-র একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। সপ্তম বেতন কমিশন চালু হলে অল ইন্ডিয়া কনজিউমার প্রাইস ইনডেক্স অনুযায়ী নিয়মিত এবং বকেয়া ডিএ পাওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। বাড়ি ভাড়া ভাতা, যাতায়াত ভাতা এবং চিকিৎসা ভাতার পরিমাণ বর্তমানের তুলনায় বৃদ্ধি পাবে। গ্র্যাচুইটি এবং পেনশনের পরিমাণও এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বাড়বে, যা অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা দেবে। এবার বুঝে নেওয়া যাক সপ্তম বেতন কমিশন কার্যকর হলে বেতন কতটা বাড়তে পারে ৷

    সপ্তম বেতন কমিশনের মূল ভিত্তি হল তার প্রস্তাবিত 2.57 ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর। অর্থাৎ, আগের বেতন কমিশনের তুলনায় মূল বেতনের গড়ে 2.57 গুণ বৃদ্ধি পাবে।

    ধরা যাক, একজন রাজ্য সরকারি কর্মচারীর যদি মূল (বেসিক) বেতন 20 হাজার টাকা হয়, তাহলে 2.57 ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর হিসাবে তাঁর মূল বেতন হবে 51 হাজার 400 টাকা। আর ষষ্ঠ পে কমিশনে রাজ্যের হারে কোনও সরকারি কর্মচারী যদি ডিএ পান 14 শতাংশ, তাহলে এই সপ্তম পে কমিশন কার্যকর হলে কেন্দ্রীয় হারে তাঁর ডিএ 50 শতাংশ বা তার বেশি হবে।

    গত মার্চে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে 25 শতাংশ বকেয়া মহার্ঘ ভাতা (DA) দেওয়ার ঘোষণা করেন রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ 31 মার্চের মধ্যে এই বকেয়া মহার্ঘ ভাতা 'রিভিশন অফ পে অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস বিধি 2029' (ROPA 2009) অনুযায়ী দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয় ৷ সেই ঘোষণা অনুযায়ী, গ্রুপ এ থেকে গ্রুপ ডি রাজ্য সরকারি কর্মীরা হাতে কত নগদ, দেখে নিন৷

    শেষবারের সরকারি ঘোষণায় গ্রুপ A থেকে গ্রুপ D সরকারি কর্মীরা হাতে কত পেলেন ?

    25 শতাংশ মহার্ঘ ভাতার (DA) হিসেবে অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের একজন গ্রুপ-ডি কর্মী হাতে পাবেন 1 থেকে দেড় লক্ষ টাকা পাবেন।

    25 শতাংশ মহার্ঘ ভাতার (DA) হিসেব অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের একজন গ্রুপ-সি কর্মী হাতে পাবেন 2 লক্ষ টাকা ৷

    25 শতাংশ মহার্ঘ ভাতার (DA) হিসেব অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের একজন গ্রুপ-এ কর্মী হাতে পাবেন 3 থেকে সাড়ে 3 লক্ষ টাকা।

    2009-19 পর্যন্ত এরিয়ারের টাকা ঢুকলে একজন সর্বনিম্ন বেতনভুগ গ্রুপ-ডি কর্মী পাবেন প্রায় 4 লক্ষ টাকার বেশি।

    2009-19 পর্যন্ত এরিয়ারের টাকা ঢুকলে একজন গ্রুপ-সি কর্মী পাবেন প্রায় 6 লক্ষ টাকার বেশি।

    25 শতাংশ DA মিললে 7-8 হাজার টাকা পেনশন পাওয়া অবসরপাওয়া গ্রুপ-ডি কর্মী পাবেন প্রায় 1 লক্ষ টাকা। (যাঁরা 2009-এর আগে থেকেই পেনশন প্রাপক, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)

    25 শতাংশ DA মিললে 10 হাজার টাকা পেনশন পাওয়া অবসরপাওয়া গ্রুপ-সি কর্মী পাবেন প্রায় 2 লক্ষ টাকা। (যাঁরা 2009-এর আগে থেকেই পেনশন প্রাপক, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)
  • Link to this news (eTV Bharat)