• জোড়াফুলের প্রদীপকে পদ্ম উপহার দিলীপের, দুই দলের প্রার্থীকে ঘিরে নাচ সমর্থকদের
    এই সময় | ১৯ মে ২০২৬
  • সুমন ঘোষ, খড়্গপুর

    বিজয় মিছিলেও সৌজন্যের রাজনীতি দেখল খড়্গপুর। মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের ‘ধন্যবাদ সমারোহ’–এ ধন্যবাদ জানাতে দেখা গেল খড়্গপুরের (সদর) পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী প্রদীপ সরকারকে। পাল্টা সৌজন্য দেখিয়ে প্রদীপের হাতে পদ্মফুল তুলে দিলেন ওই কেন্দ্রেরই বিজয়ী প্রার্থী দিলীপ! যা দেখে উৎসাহিত বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা আরও উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়লেন। বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীকে ঘিরে শুরু হল নাচও।

    এর আগেও একাধিক বার সৌজন্যের রাজনীতি দেখা গিয়েছে খড়্গপুরে। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় উঠে এসেছে দিলীপ ঘোষের নাম। ২০১৬–র বিধানসভা নির্বাচনে দিলীপের বিরুদ্ধে প্রার্থী ছিলেন কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা জ্ঞান সিংহ সোহন পাল। তাঁর সঙ্গে সৌজন্য–সাক্ষাতের কথা আজও মনে আছে খড়্গপুরের। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনেও দিলীপ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের প্রদীপ সরকারের মুখোমুখি হয়েছেন একাধিকবার। নির্বাচনের আগে মন্দিরে পুজো দিতে গিয়ে দু’জনের দেখা হয়। কিন্তু কেউ কাউকে না দেখার ভান করে এড়িয়ে যাননি। উল্টে দু’জনে হাসিমুখে এগিয়ে এসে করমর্দন করেছেন। কুশল বিনিময় করেছেন। এমনকী, ভোটের দিনেও দেবলপুরে বুথ পরিদর্শনের সময়ে দু’জনের দেখা হয়। সেই টেনশনের সময়েও সৌজন্য দেখাতে ভোলেননি দু’জনেই। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দিলীপ বলেছিলেন, ‘এই রাজনৈতিক সৌজন্য রাজ্যের মডেল হোক।’ সহমত পোষণ করেছিলেন প্রদীপও।

    যদিও এখন কোনও কিছুকেই আর সহজে ‘নিছক’ বলা যায় না। ইচ্ছে হলে কেউ নিছক ভাবতেই পারেন, তবে আত্মীয়, বন্ধু থেকে প্রতিবেশী-পরিচিত তাকে কোনও না কোনও ‘ছক’ এ ফেলে দেন। এ বার নির্বাচন ঘোষণার আগে থেকেই সেটা যেন একটু বেশি নজরে পড়েছে। পয়লা বৈশাখে কেউ সবুজ পাঞ্জাবি কিনেছেন। তা দেখে মুচকি হেসে কেউ বলেছেন, ‘বাহ্‌, দলের সঙ্গে রংটা দিব্যি ম্যাচ করে গিয়েছে।’ বেকুব হয়ে তিনি বলেছেন, ‘না, না, আমি তো...।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা! কেউ আবার স্ত্রীর কথামতো লক্ষ্মীপুজোর জন্য বাড়িতে পদ্মফুল কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। যা দেখে বন্ধুরা রসিকতা করেছেন, ‘জানি গেরুয়ার ভক্ত। তাই বলে প্রতিদিন পদ্মফুল কিনতে হবে!’

    একই ভাবে কেউ কোনও নেতানেত্রীর কাজের প্রশংসা বা সমালোচনা করলে তা–ও কিন্তু নিছক থাকেনি। কোনও না কোনও ‘ছক’–এ ফেলেছেন পরিচিতরা। তাই প্রদীপ সরকারকে দিলীপ ঘোষের পদ্ম উপহার নিয়েও হালকা রসিকতা চলছে বইকি! ওই, ছকে ফেলেই। পরিচিতরা হাসতে হাসতে নিজেদের পরিসরে আলোচনা করছেন, ‘বিজেপি দরজা খুললে তবে কি প্রদীপ সে দিকেই পা বাড়াবেন?’ কিন্তু বেশিরভাগ লোকজনই এটাকে ‘নিছক’ ভাবতে চাইছেন না। অথচ, দিলীপ ঘোষ পুরোদস্তুর পদ্মফুলের লোক। পদ্ম ফোটাতে দীর্ঘ লড়াই করেছেন। তাই তাঁর কাছে তো পদ্ম থাকবেই। আর পরিচিতদের তিনি সেই উপহারই তুলে দেবেন। এটাই সৌজন্য! কিন্তু ওই, ছুটলে কথা থামায় কে!

    গত শনিবার খড়্গপুর শহরের চাঁদনিচক থেকে গিরিময়দান ব্রিজ পর্যন্ত ‘ধন্যবাদ সমারোহ’ কর্মসূচি ছিল দিলীপের। যে পথের ধারেই রয়েছে প্রদীপ সরকারের দলীয় কার্যালয়। যে সময়ে ওই পথে দিলীপ যাচ্ছিলেন, সে সময়ে কার্যালয়ে দলীয় কর্মীদের নিয়ে বৈঠক করছিলেন প্রদীপ। ভিড়ে শোভাযাত্রা ধীরে এগোনোয় প্রদীপ কার্যালয় থেকে বেরিয়ে সোজা পৌঁছে যান দিলীপের কাছে। প্রদীপকে দেখেই হাত মেলান দিলীপ। উপহার দেন পদ্ম। তার পরে দু’জনেই পরস্পরকে ভালো থাকা এবং মানুষের কাজ করার জন্য উৎসাহ দেন।

    প্রদীপ বলেন, ‘আমি চাই, সব সময়ে এই সৌজন্য বজায় থাক। দিলীপদাও সেটা করে থাকেন। রাজনীতির মঞ্চ আলাদা। তা যেন কখনও ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে না পড়ে। উনি আমাকে ভালো থাকা ও ভালো কাজ করার কথা জানালেন। আমিও ওঁকে বললাম, খড়্গপুর শহরের উন্নয়নে তিনি যেন আরও উদ্যোগী হন।’ আর দিলীপের সেই এক কথা, ‘আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি— এই রাজনৈতিক সৌজন্য রাজ্যের মডেল হোক!’

  • Link to this news (এই সময়)