সুদেষ্ণা ঘোষাল
দীর্ঘ এক দশকের খরা কাটিয়ে অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বচ্ছ ভারত অভিযানের পর্যালোচনা বৈঠকে যোগ দিল পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যে পালাবদলের পরে, মঙ্গলবার (১৯ মে) নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে আয়োজিত এই হাইপ্রোফাইল বৈঠকে উপস্থিত থাকলেন রাজ্যের নবনিযুক্ত পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী, অগ্নিমিত্রা পাল। কেন্দ্রীয় নগরোন্নয়ন মন্ত্রী মনোহরলাল খট্টরের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই বৈঠকে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা অংশ নিয়েছিলেন। বৈঠক শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বাংলার পুর-পরিচ্ছন্নতা ও পরিকাঠামো উন্নয়নে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা করলেন অগ্নিমিত্রা।
বৈঠক শেষে মন্ত্রী স্পষ্ট জানান, দেশের শীর্ষস্থানীয় পরিচ্ছন্ন শহরগুলিকে মডেল করেই এ বার কলকাতা তথা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গকে আবর্জনামুক্ত করার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করা হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে অগ্নিমিত্রা পাল বলেন,
‘ইন্দোর, ভোপাল বা লখনউয়ের মতো শহরগুলো দারুণ কাজ করছে। আমরাও অত্যন্ত উজ্জীবিত যে বাংলা, কলকাতা, আসানসোল, দুর্গাপুর, দার্জিলিংকে এই র্যাঙ্কিংয়ে নিয়ে যাব। দিনে দু’বার করে রাস্তা পরিষ্কারের পাশাপাশি বর্জ্য পৃথকীকরণের উপরে জোর দেওয়া হবে।’
কারণ, অগ্নিমিত্রা জানান এ দিনের বৈঠক থেকে এটাও স্পষ্ট হয়েছে যে আবর্জনার পৃথকীকরণ যত বাড়ানো যাবে, ততই বেশি বেশি করে ভ্যালু এডিশন করে সেই আবর্জনাকে ফের কাজে লাগানো যাবে। আর শুধু প্রধান রাস্তা নয়, ‘ব্যাক লেন ক্লিনিং’ অর্থাৎ, অলিগলি পরিষ্কার রাখার উপরেও জোর দেওয়া হবে।
প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে দক্ষিণবঙ্গের আসানসোল ও দুর্গাপুর এবং উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং ও কালিম্পং— রাজ্যের এই চার শহরকে বেছে নেওয়া হয়েছে ‘পাইলট প্রজেক্ট’-এর জন্য। এই চার শহরের আধুনিকীকরণ ও পরিচ্ছন্নতার জন্য শিগগিরই কেন্দ্রকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ পরিকল্পনা জমা দেবে রাজ্য বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
পালা বদলের পরে, ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার হওয়ায় কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়ে রাজ্যের কাজে গতি আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। এ দিন অগ্নিমিত্রা পালের বক্তব্য থেকেও তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে।
তিনি জানান, স্বচ্ছ ভারত মিশনের ‘মাদার স্যাঙ্কশন’ থেকেই এই তহবিল পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তাঁরা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও তাঁকে আশ্বস্ত করেছেন, বাংলায় প্রকল্পের জন্য তহবিলের কোনও অভাব হবে না।
তা ছাড়া অগ্নিমিত্রার দাবি, পূর্বতন তৃণমূল সরকার স্বচ্ছতার প্রশ্নে প্রায় কোনও কাজই করেনি বললেই চলে। তিনি জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত বাজেট বরাদ্দের অনেক অর্থই অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বিগত তৃণমূল সরকারকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে রাজ্যের নতুন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী বলেন,
‘কেন্দ্রীয় বাজেটে বরাদ্দ অর্থের ৬০ শতাংশই পড়ে রয়েছে, কারণ আগের সরকার তা ব্যবহারই করেনি। অথচ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার মিথ্যা অভিযোগ করে গিয়েছে। আমাদের কাছে যে ডেটা দেওয়া হয়েছে, তাতে স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে ওয়েস্ট বেঙ্গল জ়িরো হয়ে রয়েছে। কারণ তারা কোনও প্রতিযোগিতায় অংশই নেয়নি।’
শুধু তাই নয়, তৃণমূল আমলে কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির নাম বদলে দেওয়া হতো। অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, তাঁরা আসল নামেই প্রকল্পগুলি চালাবেন। অর্থাৎ, ‘নির্মল বাংলা’ নয়, ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’।
শিক্ষা দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে স্কুলের পাঠ্যক্রমেও পরিচ্ছন্নতার বিষয়গুলি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের বলে জানিয়েছেন তিনি।
এর পাশাপাশি, বিগত ১৫ বছরে পুর দপ্তরে কী কাজ হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে কড়া অডিটের নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। আপতত সব বকেয়া বিলের অর্থ প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
দীর্ঘদিন বাদে কেন্দ্র-রাজ্য এই সদর্থক সমন্বয়ে বাংলার পুর-উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন পুর ও নগরোন্নয় মন্ত্রী, অগ্নিমিত্রা পালের এই আগ্রাসী ও আধুনিক পরিকল্পনার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় তহবিলের সঠিক ব্যবহার যদি নিশ্চিত করা যায়, তা হলে আগামী দিনে তিলোত্তমা কলকাতা-সহ সমগ্র বাংলা তার হারিয়ে যাওয়া শ্রী ফিরে পাবে এবং রাজ্য আবার স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে হয়ে উঠবে।