মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে উত্তরকন্যায় প্রথম বৈঠক, উত্তরবঙ্গের উন্নয়নে কী বার্তা দেবেন শুভেন্দু?
প্রতিদিন | ২০ মে ২০২৬
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বুধবার প্রথম উত্তরবঙ্গ সফরে শুভেন্দু অধিকারী। এদিন তিনি উত্তরের পাঁচ জেলার বিধায়ক, পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাদের নিয়ে শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় প্রশাসনিক বৈঠক করবেন। জানা গিয়েছে, সামনে বর্ষা তাই বৈঠকে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেতে চলেছে বন্যা, হড়পা বান, ভূমিধস ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা। এছাড়াও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, চিকিৎসা পরিষেবা এবং চা বাগানের সমস্যা, বেআইনি নির্মাণ, জমি ও বালি-পাথর মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য নিয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির প্রসঙ্গ।
পাশাপাশি এসজেডিএ, জিটিএ, জেলা পরিষদ, গ্রাম পঞ্চায়েত এবং পুরসভাগুলোর অচলাবস্থা ও দুর্নীতিও আলোচনায় অগ্রাধিকার পাবে। উত্তরের সার্বিক উন্নয়ন, পূর্বতন সরকারের আমলে থমকে থাকা বিভিন্ন প্রকল্প এবং পাহাড়ের উন্নয়নমূলক কাজ নিয়েও মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ বার্তা দিতে পারেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ‘বিরোধী বয়কট’ সংস্কৃতি ভেঙে তৃণমূলের বিধায়কদেরও প্রশাসনিক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এদিনের বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন ক্রীড়া ও উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক।
প্রশাসন ও বিজেপি সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী সকাল ১০টায় বাগডোগরা বিমানবন্দরে নামবেন। সেখান থেকে সোজা দলের জেলা দপ্তরে যেতে পারেন। সেখান থেকে উত্তরকন্যায়। প্রশাসনিক বৈঠক সেরে দু’টোয় বাগডোগরা হয়ে কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা মুখ্যমন্ত্রীর। এদিন শিলিগুড়ি শহরের বর্ধমান রোডে উড়াল পুলের উদ্বোধন করার কথা রয়েছে তাঁর। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, উত্তরকন্যায় প্রশাসনিক বৈঠকে সিতাইয়ের তৃণমূল বিধায়ক সঙ্গীতা রায়কেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তৃণমূল জমানার ১৫ বছরে একজন বিজেপি বিধায়ক কোনও প্রশাসনিক বৈঠকে ডাক পাননি। কিন্তু জমানা বদলাতে প্রশাসনিক বৈঠকে এবার উলটো ছবি দেখা যাবে। তবে তৃণমূল বিধায়ক বৈঠকে যোগ দেবেন কিনা তা স্পষ্ট নয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর অধিকারীর এদিনের বৈঠকে দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার এবং কোচবিহারের বিধায়করা ছাড়াও উপস্থিত থাকবেন পাঁচ জেলার জেলাশাসক, পুলিশ সুপার, পুলিশ কমিশনার ও শীর্ষ স্তরের প্রশাসনিক আধিকারিকরা।
বিধানসভা নির্বাচনে গেরুয়া ঝড়ে উত্তরের মাটি থেকে কার্যত সাফ হয়েছে তৃণমূল। জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিংয়ের মতো জেলাগুলোতে খাতাও খুলতে পারেনি তৃণমূল। বিজেপিকে দু’হাত ভরে ভোট দিয়েছেন উত্তরের মানুষ। তাই নতুন সরকারের উপর প্রত্যাশার চাপও বেশি। অন্যদিকে তৃণমূল জামানায় উন্নয়নের অছিলায় ত্রিফলা বাতি থেকে সিন্ডিকেট রাজ, সরকারি জমি-নদী-জলাভূমি দখল, চা বাগানের জমি প্রমোটারদের হাতে তুলে দেওয়া, সংরক্ষিত জঙ্গলের জমিতে বে-আইনি রিসর্ট তৈরির মতো প্রচুর অভিযোগ ঘিরে আমজনতার ক্ষোভ রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করে আইনি পদক্ষেপ চাইছেন তারা।
সেই চাপ নেহাত কম নয়। নির্বাচনী প্রচারে এসে উত্তরবঙ্গকে ঢেলে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আইআইটি, এইমস, ক্যানসার হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, সাংবিধানিক পরিকাঠামোর মধ্যে পাহাড় সমস্যার সমাধান, কামতাপুরি ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির আশ্বাস দিয়েছেন তাঁরা। এছাড়াও সামগ্রিক উন্নয়নের বার্তা দিয়েছে বিজেপি। স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনে জয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম উত্তরবঙ্গ সফর ঘিরে প্রত্যাশা তুঙ্গে। প্রশাসনিক বৈঠকের পর তিনি কী বার্তা দেন সেদিকে তাকিয়ে পাহাড়-সমতল।
জানা গিয়েছে, এদিনের বৈঠকে উত্তরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প দ্রুত রূপায়ণ, আটকে থাকা কাজ শেষ করা এবং জেলাগুলির উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হতে পারে। প্রশাসনিক সূত্রে খবর, সামনেই বর্ষা। গত বছর বর্ষায় হড়পা বান ও ভূমিধসে লণ্ডভণ্ড হয়েছে উত্তরের পাহাড়-সমতলের বিস্তীর্ণ এলাকা। নাগরাকাটা, মিরিকে কয়েকজনের প্রাণ গিয়েছে। ওই বিপদ এড়াতে স্বভাবতই বৈঠকে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেতে চলেছে বন্যা, ভূমিধস ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা।
এছাড়াও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ঢেলে সাজানো, চা বাগানের সামগ্রিক দুরবস্থা কাটানো, নেপাল সীমান্ত দিয়ে পরীক্ষা ছাড়া অবাধে নিম্নমানের চা আমদানি বন্ধ করা এবং চা শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির ব্যবস্থা করার মতো বিষয়গুলিও গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্ব পাবে কোচবিহার জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাটাতারের বেড়ার জন্য প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়ার অগ্রগতি। মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিধায়ক আনন্দময় বর্মন বলেন, “নির্বাচনী প্রচারের সংকল্পপত্রে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেটা বাস্তবায়িত করতে মানুষের কাছে দল দায়বদ্ধ। প্রশাসনিক বৈঠকে মূলত ওই বিষয়ে আলোচনা হবে।”
এদিকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর প্রথম উত্তরবঙ্গ সফরকে ঘিরে শিলিগুড়ি ও বাগডোগরায় আঁটসাট নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বাগডোগরা বিমানবন্দরে নেমে মুখ্যমন্ত্রী সড়কপথে উত্তরকন্যায় পৌঁছবেন। ভিভিআইপি কনভয়ের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে ওই নির্দিষ্ট রুটে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বাগডোগরা বিহার মোড়, গোঁসাইপুর, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট, শিবমন্দির মেডিক্যাল মোউড়, ফাঁসিদেওয়া মোড়, কাওয়াখালি এবং নৌকাঘাট মোড় পর্যন্ত ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছে। ট্রাফিক ডিসিপি কাজী শামসুদ্দিন আহমেদ জানান, মুখ্যমন্ত্রীর প্রোটোকল মেনেই সমস্ত রকম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিজেপির শিলিগুড়ি সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অরূণ মণ্ডল জানান, মুখ্যমন্ত্রী জেলা দলীয় কার্যালয়ে যেতে পারেন।